মর্গান হাউজ রহস্য

255
মর্গান হাউজ রহস্য
মর্গান হাউজকে ঘিরে কতো কতো কিংবদন্তী। ফাইল ছবি

বিশ্বজিৎ দাস :

সত্যি বলতে কী মাত্র কয়েকদিন আগেও মর্গান হাউজের নাম পর্যন্ত জানতাম না। কয়েকদিন পর দার্জিলিং হয়ে ক্যালিম্পং যাবো, সেজন্য বেছে বেছে ইউটিউবে ক্যালিম্পংয়ের ভিডিওগুলো দেখছিলাম সবাই মিলে। হঠাৎ করেই সামনে এসে পড়ল মর্গান হাউজের ভিডিও।
বাড়িটি ভৌতিক জেনে কৌতুহল হলো। ঠিক করলাম ক্যালিম্পং যখন যাবোই তখন এটা দেখে আসতেই হবে। রাত কাটানোর জন্য অনলাইনে পশ্চিম বাংলার পর্যটন মন্ত্রণালয়ে বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে চেষ্টা করলাম কয়েকবার। হলো না। শেষে হাল ছেড়ে দিলাম।

 

ঈদের আগের দিন আমরা যখন দার্জিলিংয়ের হোটেলে শেষ রাত কাটানোর জন্য উদ্যোগ নিচ্ছি, তখন আমার পুত্রধন দীপ মর্গান হাউজের কথা মনে করিয়ে দিল।
কী মনে করে ওদের নাম্বারে ফোন করলাম।। দুবারের চেষ্টায় সাড়া পেলাম। অনলাইনে বুকিং করতে পারিনি জেনে ওপাশ থেকে লোকটি বলল, চলে আইয়ে স্যার। রুম খালি রহেগা তো আপকো মিলেগা।
ঈদের দিন স্ট্যান্ড থেকে শেয়ারিং গাড়িতে উঠলাম। চমৎকার সবুজ পাহাড়ের মাঝ দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল। মাথার উপর ঘন পাইন বন। সাথে থাকা একজন ট্যুরিস্ট মাঝে মাঝেই জানালা দিয়ে ছবি তুলছিলেন। চা বিরতির জন্য গাড়ি একবার থামল। তারপর আবার চলতে শুরু করল। আস্তে আস্তে গাড়ি পাহাড় থেকে নামতে শুরু করল। আবার একটু পরেই উঠতে শুরু করল। বেশ খাড়াভাবেই। দুপুরের দিকে ক্যালিম্পং শহরে প্রবেশ করলাম।
স্ট্যান্ডে নামতেই ট্যাক্সি চালক এগিয়ে এসে জানতে চাইল, ‘মর্গান হাউজ?’
‘কত নেবেন?’
‘দুশ দিজিয়ে।’
উঠে পড়লাম। পরে জেনেছি, আসলে পাহাড়ের উপরে গেলে যাত্রী প্রতি ভাড়া ৩০ টাকা। নামলে জনপ্রতি ১০ টাকা।

 

গাড়ি যেতে থাকুক এই সুযোগে আমি আপনাদের মর্গান হাউজের ইতিহাসটা বলে নেই।

 


১৯৩০ সালে ব্রিটিশ পাট ব্যবসায়ী জর্জ মর্গান ক্যালিম্পং হিলে বাড়িটি তৈরি করেন। ব্রিটিশ কলোনিয়াল আর্কিটেকচারে বাড়িটি তৈরি। মিসেস মর্গান মারা যাওয়ার পরও তিনি বাড়িটিতে থাকতেন। তিনি মনে করতেন, এখানে মৃত স্ত্রীর আত্মা রয়েছে। অনেকেই এখানে রাত কাটাতে গিয়ে মিসেস মর্গানের গলার আওয়াজ, তার জুতার হিলের শব্দ, ফিসফিসানি ইত্যাদি শুনতে পেয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আগে এটি দুরপিন টুরিস্ট লজ নামে পরিচিত হলেও বর্তমানে এটি মর্গান হাউজ নামেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে অনলাইনে বুকিং করতে হয়। সেই ভয়টাই পাচ্ছিলাম। আমাদের তো বুকিং করা নেই। কিন্তু পৌঁছানোর পর জানতে পারলাম একটি রুম খালি আছে। আর কী সৌভাগ্য আমাদের, মিসেস মর্গানের বেডরুমটাই ভাড়া পেলাম!

 

কাঠের সিড়ি বেয়ে দোতলাতে উঠে গেলাম। লক্ষ্য করলাম, বেয়ারা লাগেজ দিয়েই দ্রুত নেমে গেল। রুমে ঢুকে অবশ্য মুগ্ধ হলাম। সব আধুনিক ব্যবস্থাই বর্তমান আছে। ফোনে দুপুরের খাবার অর্ডার দিয়ে স্নান সেরে নিলাম সবাই। নিচতলায় অবস্থিত ডাইনিংয়ে খেয়ে-দেয়ে লনে চলে গেলাম ছবি তুলতে। দীপ আর রীতা, মিসেস মর্গানের জানালায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলল। একটু পরে হাউজ থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুরপিন মনেস্ট্রি দেখতে গেলাম। এতদূর আর উপরে যে প্রায় কাছে গিয়েও না দেখে ফিরে এলাম হাউজে। আসলে ওসবের চেয়ে হাউজ বেশি টানছিল। মর্গান হাউজের ওয়েটিং রুমে বসে পাকোড়া আর চা খেলাম। ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হল। চারপাশ অন্ধকার। রীতা বলল, ‌’রুমেই চলে যাই।’ সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে যাবো, বিদ্যুৎ গেল চলে। গায়ে কাটা দিয়ে উঠল কেন জানি। টের পেলাম,পাশ কাটিয়ে কে যেন নেমে গেল।

 

অন্ধকারে নিচে নেমে এলাম সবাই। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। ডাইনিংয়ের দুজন ছাড়া আর কেউ যে নেই, বেশ বুঝতে পারলাম। একটু পরেই বিদ্যুৎ চলে এল। রুমে ফিরে টিভি দেখলাম। ফাঁকে একবার খেয়ে এলাম। আমি আর দীপ বসে টিভি দেখছি। দীপের মা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে বলল, ‘তুমি কি আমাকে ডাকলে?’
‘না তো।’
‘মনে হল, তুমি ডাকলে!’
দীপও সাক্ষী দিল, ‘না। বাবা তো ডাকেনি।’
যাহোক বাইরে বৃষ্টি। আমরা শুয়ে পড়লাম।
সকালে উঠে জানালা দিয়ে তাকাতেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলাম। এটাই এ রুমের স্পেশালিটি।
নাস্তা খাওয়ার পর আমরা মর্গান হাউজ ত্যাগ করলাম। উঠলাম একটা হোমস্টে তে। সেখানে রাতে শুয়ে শুয়ে আমরা গল্প করলাম মর্গান হাউজকে নিয়ে। ‘আচ্ছা, তুমি কি কিছু দেখেছিলে?’ আমার কাছে জানতে চাইল রীতা।
‘আমি শুধু বাথরুমে একটা আওয়াজ পেয়েছি।’ বললাম।
‘কই আমরা তো পাইনি।’
দীপ বলল, ‘আমি একটা মহিলার গলার আওয়াজ পেয়েছি।’
তখন আমার মনে পড়ল, যা আমি তখন ওদেরকে বলিনি-দীপ ভয় পেয়ে যেতে পারে।
মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। অস্বাভাবিক নীরবতা যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল সব। ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে ঢুকেছিলাম। সেই শব্দ!

 

একটু পর বের হয়ে অজানা আকর্ষণে কাচের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আধো আলোতে পাহাড় আর ফুলের বাগানের অসীম সৌন্দর্য বিমোহিত করে রাখল আমাকে। হঠাৎ টের পেলাম শুধু আমি না,আরো কেউ আছে এখানে! নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো আমার। স্ট্যাচু হয়ে রইলাম। মনে হল অনন্তকাল পরে ঘাড় ঘোরাতে পারলাম। আমার ঠিক পেছনেই বড় একটা আয়না। দেখলাম…।
জগতের সব রহস্য প্রকাশিত হয় না। কিছু লুকায়িত থাকে। এটাও না হয় থাক। আমার মত অভিজ্ঞতা সবার নাও হতে পারে। হেটার্সরা বলবে, ‘মর্গান হাউজ মে কোই নেহি, কুছভি নেহি।’
কিন্তু আমার মত লাভার্সরা বলবেই, কোই তো হ্যায়, কুছ ভি হ্যায়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, পদার্থবিদ্যা বিভাগ
দিনাজপুর সরকারি কলেজ, দিনাজপুর