প্রসঙ্গ : শিশু-কিশোর সাহিত্য

286
প্রসঙ্গ : শিশু-কিশোর সাহিত্য
প্রসঙ্গ : শিশু-কিশোর সাহিত্য

আইভি চট্টোপাধ্যায় :

‘সে এক দেশে ছিল এক রাজা। রাজার ছিল তিন রাণী…’ এরকম একটা গল্প শোনেনি, সাধারণ একটি বাঙালি পরিবারে এমন শিশু বোধহয় বিরল।

শিশুসাহিত্য প্রসঙ্গে রূপকথার কথা না বললেই নয়। দেশী বা বিদেশী যে কোনো শিশুসাহিত্যের কথা বলতে গেলেই রূপকথারা মনে পড়ে যায়। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বা গ্রিম-অ্যান্ডারসনের রূপকথার গল্প নিয়ে শৈশব কাটেনি, এমন শিক্ষিত সাহিত্যপ্রেমী মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অক্ষরজ্ঞানের বয়স থেকেই কোনো একটা সাহিত্য যদি মনে থেকে গিয়ে থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন করলে অনেকেই যে হাতে গোনা দু’চারটি বইয়ের নাম করবেন সেগুলো হল ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘আলিবাবা আর চল্লিশ চোর’, ‘আলাদিন’, ‘সিন্দবাদ’, ‘অ্যালিস ইন দ্য ওয়াণ্ডারল্যান্ড’, ‘গালিভারস ট্র্যাভেলস’… এমন সব শিশু-কিশোর সাহিত্য। আমি মোটামুটি নিশ্চিত।

 

রামপদ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘ছোটদের জন্যে লেখাকে শিশুসাহিত্য বলা হয় বলেই ব্যাপারটা নেহাত শিশুসুলভ নয়।’ কথাটা মনে ধরেছিল। শিশুসাহিত্য বলতে কোন কোন লেখাগুলোকে ধরা হবে, সে নিয়ে আমার মানে বিস্তর ভাবনা। আসলে শৈশব আর কৈশোর এত কাছাকাছি যে কিশোরসাহিত্যের লেখাগুলোকেও অনায়াসে শিশুসাহিত্যের মধ্যে ধরে ফেলা যায়।

শৈশব আর কৈশোর, স্বপ্ন দেখার বয়স। কল্পনায় পৃথিবী গড়ার বয়স। নির্মল স্বচ্ছ মনে স্বপ্ন দেখতে শেখার বয়স। শিশুসাহিত্য সেই স্বপ্ন-দেখা মনের সাথী। শিশুসাহিত্যিকরা এক একজন শক্তিশালী জাদুকর। ‘চিচিং ফাঁক’ মন্ত্র শিখিয়ে কঠিন পাথরের দেওয়াল সরিয়ে ফেলা কি যার তার কাজ! এই একটি কথায় শিশুমনের দুয়ার খুলে ঢুকে পড়েন লেখক, চিচিং ফাঁক।

 

বিদেশী শিশু আর কিশোর সাহিত্য অনুবাদে পড়া প্রথম। ইংরেজি মূল বইগুলো পরে কিছু কিছু পড়লেও অন্য ভাষার মূল বই পড়াই হয়নি। তবু তাতে মনের ঝলমলে ভাবের ঘরে একটুও কম পাওয়া হয়নি। ছেলেবেলায় পড়া রুশ সাহিত্যের বইগুলোর মোটা মোটা পাতা, বাঁধাই, রঙিন ছবি… এখনো চোখে লেগে আছে। মনেও।

আলাদিনের জিন, আশ্চর্য প্রদীপের ঘষায় সে এসে পড়লেই সব পাওয়া হয়ে যাবে। আহা। দেশের বাড়ি গিয়ে ঠাকুমার পুরোনো সিন্দুক থেকে একটা পেতলের প্রদীপ পেয়ে কৈশোর-পেরোনো আমি সবার চোখ বাঁচিয়ে ঘষে ঘষে দেখেছিলাম, সত্যি সত্যি যদি একটা জিন আসে! বড় হয়ে গেলেও যে একটি শিশু মনের মাঝে ঘুমিয়েই থাকে, সে উপলব্ধিও সেদিনই হয়েছিল। এই অনুভব শিশুসাহিত্যের হাত ধরেই।

‘কোন কোন বই এমনই জীবন্ত হয় যে সর্বদাই ভয় হয় যে-সময় বইটাকে পড়া হচ্ছে না সেই ফাঁকে সেটা বদলে গেছে, সরে গেছে নদীর মতন; যখন পাঠক তার জীবন নিয়ে ব্যস্ত ছিল তখন বইটাও তার নিজের জীবন চালিয়ে যাচ্ছিল, নদীর মতন এগিয়ে যাচ্ছিল, চলে যাচ্ছিল দূরে…’(A Captive Spirit:Selected Prose-Marina Tsvetaeva)

রুশ কবি মারিনা ত্‍সভেতায়েভার এই কতগুলো ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় তর্জমা করেছিলেন কেতকী কুশারী ডাইসন। শিশুসাহিত্য সম্পর্কিত আলোচনায় এ উদ্ধৃতিটুকু প্রাসঙ্গিক।

প্রায় অবোধ বয়সে পড়া বইগুলো এমন জীবন্ত হয়ে স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে গেছে যে, আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় এই বইগুলোর সব চরিত্র সত্যিই জীবন্ত। ব্যস্ত যাপনের জীবন-বৃত্তপথে অনেকদিন হয়ত দেখা হয় না তাদের সঙ্গে, কিন্তু মনে পড়লেই দেখি নিজেদের জীবন নিয়ে পায়ে হেঁটে কিংবা নদীর ঢেউয়ের মতো ভেসে ভেসে এসে ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই চলছে তারা। আজীবনের সঙ্গী।

তাই বুঝি একদিন যখন আমার শিশুকন্যা ড্রয়িংরুমের কার্পেটে বসে চোখ বন্ধ করে দু’দিকে ডানার মতো দু’হাত ছড়িয়ে ম্যাজিক কার্পেটে উড়ে চলে, আমি মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে দিই যদি আমিও সওয়ার হাতে পারি! হিংসুটে দৈত্য মহাশয়ের বাগানে বা লিলিপুটের দেশে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মজা মনে পড়ে যায়।

 

ছোটবেলায় ঝড় উঠলেই আমার শিশুকন্যা ‘সুখু দুখু’-কে মনে করে আধফোটা কথায় বলে উঠত, ‘যাহ, আজ তো সব তুলো উড়ে গেল। না মা?’ তারপর একটু দু:খ দু:খ হয়ে যেত মুখটা, ‘ইস আমারও যদি একটুখানি তুলো থাকত!’ হয়ত বা কল্পনা করত, দুখুর মতই বাতাসের সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে চাঁদের বুড়ির সঙ্গে দেখা করবে কোনোদিন । চাঁদের মধ্যে চরকা কাটে, সেই চাঁদের বুড়ি।

‘আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা’.. একটি শিশু তার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, চাঁদের বুড়িই কি চাঁদমামার মা? তাহলে চাঁদের বুড়ি কি একজন দিদা?

‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে ধান দেব মেপে’… গাইতে শিখেই প্রশ্ন তুলেছিল আমার শিশুকন্যা, ‘ধান কি মা?’ বৃষ্টির সঙ্গে ধানের সম্পর্কই বা কি! ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদে এল বান’… বাড়ির পাশের শুকনো নালাটায় তুমুল বৃষ্টিতে জলপ্রবাহ দেখে ‘নদে এল বান’ কল্পনা করে নিতে একটুও অসুবিধে হয় না ছোট্টমনের, সমুদ্রের ছবিও দেখে ফেলে কেউ কেউ। সূর্যের সঙ্গে হাসতে শেখে, বাতাসের সঙ্গে উড়ে যেতে শেখে।

আহা, এই কল্পনা এই নির্মল ভাবনা তো শিশু-ছড়া শিশু-গল্পের হাত ধরেই।

সদ্য-কিশোরী কন্যা আবার রবিনসন ক্রুসোর ভক্ত, আমিও একদিন নতুন করে রবিনসন ক্রুসো পড়ে ফেলি। আঙ্কল টম’স কেবিন পড়ে মেয়ের চোখে জল, এতবছর পেরিয়ে এসে আমিও কাঁদি আবার। আর বড্ড মনকেমন করে আমার। ঝলমলে দিনগুলো যে কোথায় হারিয়ে গেল!

কবে সেই একজন শিশুসাহিত্যিক কল্পনার জাদুদণ্ড হাতে নিয়ে সিন্দবাদকে গড়েছিলেন, আজও তাঁকে কুর্ণিশ জানাতে হয়। ‘চাঁদের পাহাড়’-এ হাত ধরে নিয়ে গেছেন বিভূতিভূষণ, অবনীন্দ্রনাথের ‘রাজ কাহিনী’ আর ‘বুড়ো আংলা’ পাঠে কি যে তৃপ্তি। উপেন্দ্রকিশোরের ‘টুনটুনির বই’ পড়েনি, এমন একজন বাঙালি শিশু পাওয়া যেত না সেকালে। সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’ আজও সব বয়সের পাঠকের প্রিয়। ‘হযবরল’-র মতো একটি লেখা সমগ্র বিশ্বের শিশুসাহিত্যে পাওয়া যাবে কিনা কে জানে। পাগল দাশু-র কান্ডকারখানায় হেসে কুটিপাটি হয় আজকের শিশু-কিশোরও, আমাদের সময়ের মতোই। তবে তাদের অনেকেই নিজে নিজে সে আনন্দ-আস্বাদ নিতে পারে না, পড়ে শোনাতে হয়।

আমার খুব মনে হয়, আমাদের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বা ‘আবোল তাবোল’ যদি কেউ ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন! যেমনটা পাওয়া যায় ট্রানস্লেশন তার কথা বলছি না। ট্রানস্লিটারেশন। প্রতিবর্ণীকরণ। এ প্রজন্মের শিশুদের খুব উপকার হত।

‘থাম্বেলিনা’ পড়ে মুগ্ধ শিশুকন্যাকে আমি যখন দেড়-আঙুলে মানুষটার গল্প পড়ে শোনাই, সে একইভাবে মুগ্ধ আর উত্তেজিত হয়ে উঠছে এ বাস্তব অভিজ্ঞতা।

প্রভাতকুমার থেকে হালের সুনীল-শীর্ষেন্দু সবাই বড়দের জন্যে লেখার পাশাপাশি ছোটদের জন্যেও লিখেছেন। আজকালকার নবীন লেখকদের অনেকেই ছোটদের জন্যে খুব ভালো গল্প কবিতা লিখছেন। তবু আমার কেমন মনে হয়, ঠিক ঠিক এগোতে এখনও দেরি আছে।

এনিড ব্লাইটনের গল্পে আজকের কিশোরী যেভাবে আইডেন্টিফাই করে নিতে পারে, তেমনটা আমাদের বাংলা সাহিত্য পড়ে কেন হয় না এখনো? ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত আজকের প্রজন্ম যত সহজে ‘সিন্ডারেলা’-র হাত ধরে ফেলে, তেমন করে কেশবতী রাজকন্যার হাত ধরতে পারে না কেন? কেন পায় না ‘সোনার কাঠি রূপোর কাঠি’-র স্পর্শ?

দোষ আমাদের, তার মাতৃভাষায় শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করতে অপারগ আমরা। কেবল নালিশ করি, ‘আজকালকার ছেলেমেয়েরা এক্কেবারে বাংলা পড়ে না ।‘ একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও আমার একান্ত একটুখানি ভাবনা এখানে লিখেই ফেলি। ইংরেজি বর্ণপরিচয়ের রঙচঙে বইগুলোর মতো করে আমাদের সাবেক কালের বর্ণপরিচয় বা সহজপাঠ একটা রূপবদল করতে পারলে কেমন হত?

আসলে বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্যে লেখাকে ‘শিশুসুলভ’ মনে করি আমরা, বাঙালিরাই। কিন্তু জীবনের অনেকখানি পথ পেরিয়ে এসে আজ বুঝি, গল্প বোনার কৌশলে নিতান্ত ছেলেবেলায় পড়া একটা গল্প পাঠকের আজীবনের স্মৃতিসঙ্গী করে দেওয়া নেহাত শিশুসুলভ কর্ম নয়।

তিন রাজকন্যা, ভাগ্যের ফেরে দরিদ্র রাজকন্যা, সাদা ঘোড়ায় চেপে এসে তাকে উদ্ধার করবে
রাজপুত্র… সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে…
ভাগ্যের সুতো কাটতে পারে এমন বিড়াল, বনদেবী, জলকন্যা…
দেবী, দানব, একটা আয়না যা দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরীকে দেখা যায়…
জিপসি মেয়ে, সাতজন বেঁটে মানুষ, রাজাকে গান গেয়ে শোনানো বুলবুল পাখি…
মস্ত একটা সূর্যমুখী ফুল, সূর্যমুখী ফুল যে সর্বদা সুরজের দিকেই মুখ ফিরিয়ে থাকে সেই জানাটা হয়ে যায় অবোধ বয়সেই…
বসন্তে ফুলের বাগানের হেসে ওঠা, শীতের গাছপালা পাতাঝরা… আর সেইরকম এক ঠান্ডা পাতাঝরা রাতে প্রিয় বন্ধুর প্রাণ বাঁচাতে গাছের ডালে সবুজ পাতা এঁকে আসা…

এ হেন রূপকল্প সোজা কথা! এ কি সত্যিই শিশুসুলভ ব্যাপার!

‘ছোটদের রামায়ণ’ বা ‘ছোটদের মহাভারত’ পড়ে অবোধ অচেতন বয়সের পাঠক যেভাবে মহাকাব্যের সঙ্গে পরিচয় করে ফেলে, সততা ন্যায় শুদ্ধতাবোধের ভিত তৈরি হয়, তা আর কিছুতে নয়। ‘ইশপের গল্প’ বা ‘জাতক কথা’গুলোও তাই। ছেলেবেলার সেই শিক্ষাই জীবনপথে ফিরে আসে বারবার।

ছোট্ট পাঠকের মন পাওয়া সবচেয়ে কঠিন। অবলীলায় শিশুমনের সঙ্গী হয়েছে এই সব বই।

সাহিত্যিক যখন ছোটদের জন্যে লেখেন, তখন শিশু মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবনাটার সঙ্গে সঙ্গে থাকে সৌন্দর্যবোধের চেতনা । ছোট্ট পাঠকের ছোট্ট পৃথিবীর মধ্যে আছে কত শহর, কত দেশ, কত, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, দ্বীপ, কতরকম মানুষ । ছোট্ট পাঠক সেই পৃথিবীটাকে ভালোবাসতে শুরু করে। কোথায় সাহারা মরুভূমি, কোথায় প্রশান্ত মহাসাগর, কোথায় আমাজন, কোথায় বা মিসিসিপি ভোলগা গঙ্গা পদ্মা… অবচেতনেই শিশু হয়ে ওঠে মহাবিশ্বের অংশীদার । শুরু হয় জীবনপথে নিজেকে খুঁজে নেবার পথ চলা ।

সেদিন খবরে শুনলাম, একটি নতুন গ্রহ আবিষ্কার করেছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। টিভির আলোচনায় শুনছিলাম, কিভাবে এই গ্রহ মানুষের বাসযোগ্য করার ভাবনাচিন্তা হচ্ছে। হয়ত একদিন এই পৃথিবী থেকে মানুষ গিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করবে। কল্পবিজ্ঞানের গল্প,সত্যি হতে খুব দেরি নেই আর। এই খবরটার প্রেক্ষিতে রোজকার হিংসা দ্বেষ হানাহানি, নানা ক্ষুদ্রতার খবর এত তুচ্ছ হয়ে গেল!

আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে গেল আবাল্য পড়ে আসা অদ্রীশ বর্ধনের লেখা, সত্যজিত্‍ রায়ের অন্য গ্রহ থেকে আসা ‘মানুষ’-প্রাণীদের কথা। সেই ‘এলিয়েন’-রা বন্ধু হয়ে আসে, ভুল করে ধরে নিয়ে যায় পৃথিবীর এক ‘মানুষ’-কিশোরকে। পরে ঘুম ভেঙে সে নিজেকে ফিরে পেলেও মন পড়ে থাকে সেই অচেনা বন্ধুদের কাছেই।

সরল শিশুমন মহাবিশ্বের সঙ্গে আত্মীয়তা পাতানোর মন্ত্র শিখে ফেলে অবলীলায়। আজ আর তাই এই নতুন পরিস্থিতিতে মহাকাশবিজ্ঞানের হাত ধরে নতুন ‘পৃথিবী’-র স্বপ্নে একাত্ম হতে বেগ পেতে হয় না শিশু-কিশোরসাহিত্য পাঠকের।

‘আমার কবিজীবন প্রসঙ্গে’ লিখতে গিয়ে কেতকী কুশারী ডাইসন বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় সারল্যের গান আর অভিজ্ঞতার গানের (song of innocence আর song of experience) দ্বন্দ্বটা এক অর্থে মৌলিক। আমরা প্রথমটাই লিখতে চাই। পারি না, তার বদলে দ্বিতীয়টা লিখতে হয়। আমরা ইউটোপিয়ার আনন্দলোকে পৌঁছতে চাই, কিন্তু আমাদের লেখার একটা বড় অংশ দু:খবিষয়ক, নিজেদের এবং অন্যদের দু:খ বিষয়ে।’

ভারি সুন্দর ভাবনা। মনে ধরেছিল আমার। ভেবে দেখেছি, শিশুসাহিত্যের মূল কথা হল song of innocence, সারল্যের গান। সারল্যের গান সবাই গাইতে পারেন না।

লীলা মজুমদারের এক সাক্ষাত্‍কারে পড়েছিলাম এমন একটি কথা, ‘আমার গোটা ছোটবেলাটা আমি ছোটদের কাছে ধরে দিতে চাই।’

শৈশবের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে লীলা মজুমদার এঁকে ফেলেন একটি নরম ঝিলিমিলি ছবি। নীল আকাশ, লাইল্যাক আর ল্যাবার্নামের পাতায় রোদ ঝরে পড়ে মাখনের মতো, সোনার মতো…

‘গল্প স্বল্প’, মজলিসি ঢঙে শিশু বালক কিশোর পাঠকের জন্যে লেখা পাঁচমিশেলি মজাদার হরেক রকম গল্পের সম্ভার। ‘বেড়ালের নাম স্যান্ডো’, ‘বেড়ালের নাম ফুলী’, ‘বাঘ শিকার’… ছেলেমানুষী মনটি ধরে রাখা কি সহজ কথা! পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার ম্যাজিক জানা চাই। ‘পদীপিসির বর্মীবাক্স’, ‘হলদে পাখির পালক’ পড়ে বড় হয়নি, আমাদের সময়ে এমন বাঙালি প্রায় ছিলই না।

যতই টিভির নানা রঙিন চ্যানেল জুড়ে কার্টুন দাপদাপি করুক, স্মার্টফোনে মোবাইল-গেম খেলা আসুক, নীল তিমি খেলার মরণফাঁদ থাকুক, শিক্ষার আলোমাখা সাধারণ পরিবারে সব শিশুর ছেলেবেলাটা একইরকম। আমার শিশুকন্যার সঙ্গে বাড়িতে কাজ করতে আসা টুসুর শিশুকন্যাটিরও বিশেষ তফাত নেই। শিশুমনে শ্রেণীসচেতনতা থাকে না। কল্পনার দুনিয়ায় দুজনেই একইরকম সাবলীল, স্বচ্ছন্দ। তাই টুসুর কন্যা অবলীলায় ‘টিঙ্কল’ আর ‘টিনটিন’ পছন্দ করে, দুই শিশু একইসঙ্গে ডানা মেলে পাড়ি দিতে পারে কল্পনার আকাশে। ঠিক যেমন একটু পরে ছোট ছোট হাঁড়িকুড়ি নিয়ে ঘরকন্নার খেলা খেলবে, গলায় স্টেথো নিয়ে ডাক্তার-রুগী, কিংবা হাতে স্কেল নিয়ে শিক্ষক-ছাত্রী।

বলতে চাইছি যে, একটু বড় হয়ে বাস্তবের জীবনপথে দু’জনের পথ চলাটা যতই আলাদা হোক, যতই মাপা-হাসি মাপা-গান মাপা-আনন্দের আলাদা রাস্তায় যাত্রা হোক, বড় হবার যাত্রাপথে একটুখানি ছোটবেলাটাকে সঙ্গী করে রেখে দেওয়া যায় না? কত সমস্যাই মিটে যায় তাহলে। নি:শব্দে এই কাজটি করেন শিশু-সাহিত্যিকরা।

কল্লোলযুগের প্রায় সব পত্রিকা সব সম্পাদক প্রকাশক সাহিত্যিক ছোটদের কল্পনার প্রসার চেয়েছেন । সে যুগের সন্দেশ, শিশুসাথী, শুকতারা, রঙমশাল, মৌচাক। কিশোরভারতী পত্রিকায় ধারাবাহিক, ভালুক-মানুষ ‘ভাবা’.. কিশোরভারতী এলেই আমাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি, কে আগে পড়বে।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা, বুদ্ধদেব গুহের ঋজু আর ঋভু, সমরেশ বসুর গোগোল, সত্যজিত্‍ রায়ের ফেলুদা, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের রুকু সুকু, শুকতারা-য় ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডব গোয়েন্দা… শিবরাম চক্রবর্তী, পরশুরাম, আশাপূর্ণা দেবী… কত নামই যে মনে পড়ছে। শ্যাওড়া গাছ থেকে ভূত পেত্নী, কিছুই বাদ নেই। উপেন্দ্রকিশোরের ভূতের রাজা গুপী-বাঘাকে কেমন তিন তিনটে জম্পেশ বর দিয়ে দিল… পরশুরামের ভূতেরা তো রীতিমতো হাসিয়ে দিতেও পারে।

আহা, অমন ভূত কি আর পাওয়া যায় না! আজকের শিশু-বালক-কিশোর কি কেবল অদ্ভুতুড়ে সিরিয়াল দেখবে টিভিতে!

যে কোনো দেশের সমাজে ছোটদের জীবন গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে শিশু-কিশোর সাহিত্যিকদের অবদান অনেকখানি। ছোট বলেই যে তাদের জীবনে কোনো জটিলতা নেই, তা তো নয়। আড়াই বছর বয়স থেকে লেখাপড়ার গন্ধমাদন পর্বত বয়ে বেড়ানো। বিকেলে সবুজ মাঠ আর হাতছানি দিতে পারে না। শুধু লেখাপড়া শিখলেই তো হবে না! আঁকতে হবে, গাইতে হবে, বিলিতি বাজনা শিখতে হবে, কত্থক ভারতনাট্যম মোহিনীআট্যমের পাশাপাশি হিপহপ সালসা শিখতে হবে, সাঁতার কাটায় চ্যাম্পিয়ন হতে হবে, আবার সানিয়া মির্জার মতো টেনিস খেলাটাও শিখে নিতে হবে। ছেলে হলে ক্রিকেটটা মাস্ট। আজকাল ক্যারাটে তাইকুণ্ডুর জমানা, না শিখলে চলবে?

আমরা বাবা-মায়েরা সুযোগ পেলেই জ্ঞানদান করব। আর শিক্ষকদের কথা তো বাদই দিলাম, ছাত্রছাত্রীমাত্রেই তাঁদের প্রবল প্রতিপক্ষ। কোনো ছাত্রের বাবা যদি একটু অনুসন্ধিত্‍সু হয়ে ছেলের পড়াশোনার খবর নিতে চান, সে ছাত্রটিকে তাঁরা অর্থাত্‍ শিক্ষকরা সংহার করেই ছাড়বেন। মন্টেসরি স্কুলের শিক্ষকও আড়াই বছরের শিশুর মনস্তত্ত্ব বোঝেন না। বোঝেন না বলাটা ভুল, বুঝতে চান না, বোঝার চেষ্টা করেন না। আছে শুধু নিয়ম, আর শাসন।

কোনো কোনো সহৃদয় মানুষ আজকাল ‘লার্নিং উইথ ফান’ মডেল নিয়ে কাজ করছেন অবশ্য, তবু শিশু নিজে নিজেই বুঝে নেয় ‘ফান’ শব্দটার সঙ্গে শুধুই অনুশাসন নেই, শাসনটাই আসল। এই শাসিত অনুশাসিত জীবনে গল্পের বই পড়ে আর সময় নষ্ট না করে টিভির কার্টুন বা মোবাইল-ফোনের গেম জাতীয় বিনোদন বেশি পছন্দ করে ফেলছে ছোটরা। এটাই ঘটনা। ছোটবেলা থেকে বইমুখী পাঠমুখী সাহিত্যমুখী করার বিশেষ অবদান নেই সমাজের নিয়মে।

এই পরিস্থিতিতে একজন সাহিত্যিককে নতুন করে গল্প বলার কৌশল শিখতে হয়। এমন কথা বলতে হবে যা শিশু অন্তরে ধারণ করতে পারবে, এমন ভাবনা যার সঙ্গে ছোট ছোট মানুষরা একাত্মবোধ করবে, আইডেন্টিফাই করা যাকে বলে। হ্যারি পটার সিরিজের তুমুল জনপ্রিয়তার কারণ এই আইডেন্টিফাই করা।

সবচেয়ে বড় কথা, এমন লিখতে হবে যা শিশুকে আনন্দ দেবে। শৈশবের অন্তর্লোকে পৌঁছনো সহজ কথা নয়। শিশুমনের বৈশিষ্ট্য হল, বিষয়-বৈচিত্র্য খোঁজা। একই জিনিস বারবার পড়বে না তারা, ঠিক যেমন খুব পছন্দের হলেও রোজ টিফিনে চাউমিন খাওয়া পছন্দ করবে না। গল্পে, ছড়ায়, কবিতায়, বিষয়ে, ভাবনায় বৈচিত্র্য। এই শিশুসাহিত্যের মূল চাহিদা।

গোয়েন্দাগল্প পড়তে ভালোবাসে যে কিশোরী, তাকে দেখি ভূতের গল্পও পড়ছে গভীর মনোযোগে। জঙ্গলের গল্প পড়তে ভালোবাসে যে কিশোর, সে কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়ছে গোগ্রাসে। লেখাটা টানলেই হল। এই পাঠককে টানা, বিশেষত অল্পবয়সী পাঠককে টানা ব্যাপারটায় সাহিত্যিকের অবদান অনেকখানি। এমন লেখা যা তার সারাজীবনের সঙ্গী হবে, আজকের শিশু-কিশোরের আগামীকাল ঋদ্ধ হয়ে থাকবে, শোভন ও সুন্দরের চেতনার বিকাশে মনন সমৃদ্ধ হবে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ যেমন।

আজ যে ছোটদের জাদুপৃথিবীটা সত্যিই হারিয়ে গেছে। জাদুদণ্ড হাতে নিয়ে শিশু-কিশোর সাহিত্যিকের এগিয়ে আসাটা খুব জরুরী আজ।

সরল শিশুমন খোঁজে নতুন আলো, নতুন আকাশ, নতুন দিগন্ত। পাহাড় পেরিয়ে, অরণ্যের সবুজ হৃদয়ে, সমুদ্রের অতলে। সুযোগ পেলেই কল্পনা আর রোমাঞ্চের জগতে পৌঁছে যাওয়া। পাখির মতো, ডানা মেলে সুদূরে উড়ে যাওয়াটাই স্থির। শিশুসাহিত্যের হাত ধরে ছোটদের এই ওড়াটা হোক মসৃণ, খুশির। কিশোরসাহিত্যপাঠের লাগামছাড়া আনন্দে তেজী ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে কিশোর-কিশোরীরা ছুটে চলুক নতুন দিগন্তের সন্ধানে। এইটুকু কামনা আমার।

বাস্তবের জীবনপথে চলার রসদ হিসেবেই স্মৃতিসঙ্গী হয়ে উঠুক সাহিত্য। পথ চলতে চলতে নবীন কচি মন গেয়ে উঠুক আপনমনে, ‘এলেম নতুন দেশে’।

 

লেখাটি অবসর ব্লগ থেকে সংগৃহীত