পুতুলবাড়ির গল্প

294
পুতুলবাড়ির গল্প
পুতুলবাড়ি। ছবি সংগৃহীত

খন্দকার মাহমুদুল হাসান   

প্রায় ষাটবছরের মতো হতে চলল। আজও  ভুলতে পারিনি একটা বাড়ির কথা। বাড়িটা আমাদের বাসা থেকে অনেক দূরে। সবাই বাড়িটাকে চিনত পুতুলবাড়ি নামে। আমার শখ জেগেছিল সেই বাড়িটা দেখার। সেসময়  মামা বেড়াতে এসেছিলেন। বলতেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। বিকেলবেলায় রওনা দিলাম আমরা। যদিও বলছি আমরা রওনা দিয়েছিলাম, কিন্তু আসলে রওনা দিয়েছিলেন মামা। আমি শুধু তার আঙুল ধরে হাঁটছিলাম।

গরমের বিকেল। ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছিল। শহরটির রাস্তাঘাটে তেমন ভিড় ছিল না। রিকশা আর সাইকেলের বেল মাঝেমধ্যে ক্রিং ক্রিং করে বাজছিল।  দু’চারটে সাইকেল-রিকশা চলে যাচ্ছিল পাশ কাটিয়ে। তবে প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাক বা মোটর সাইকেলের মতো যন্ত্রচালিত বাহনের কোনো দেখাই মিলছিল না। মিলবেই বা কী করে। সেকালে অমন মফঃস্বল শহরের রাস্তায় গরুর গাড়ির দেখা  মিললেও যন্ত্রশকটের হদিস মিলত না। তো, পুুুতুলবাড়িতে আমরা পৌঁছে গেলাম নির্বিঘ্নেই।

পুতুল বাড়ির রহস্য গল্প
পুতুল বাড়ির রহস্য গল্প

 

 

পুতুলবাড়ি। ছবি সংগৃহীত
পুতুলবাড়ি। ছবি সংগৃহীত

সে এক মস্ত বাড়ি। পাঁচিলে ঘেরা সেই বাড়ির আসল বৈশিষ্ট্য কিন্তু ওই পাঁচিলটাই ছিল। পাঁচিলঘেরা বাড়ি তো হামেশাই দেখা যায়। কিন্তু অমন পাঁচিলের দেখা কি আর মেলে? আমি চোখজোড়া গোল্লা গোল্লা করে দেখলাম, পাঁচিলের ওপর একটু পরপরই দাঁড়িয়ে আছে একেকজন নারী। তবে এদের কারো দেহেই প্রাণ নেই। তারপরও অনেকের মুখেই লেগে রয়েছে হাসির রেখা। ওরা সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একই জায়গায় বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। ওরা সবাই পাষাণমূর্তি। এই মূর্তি বা পুতুলগুলোর কারণেই বাড়িটার নাম হয়েছে পুতুলবাড়ি। এতদিন পরে যতটা মনে পড়ে পুতুলগুলোর রং ছিল নীলচে ধূসর। হয়তো কিছু শ্যাওলাও জমেছিল অনেক পুতলের গায়ে।

পুতুলবাড়িটাই ছিল এদিকে শেষ বাড়ি। এরপর ঢালু জায়গা। তারপর গড়াই নদী।  অনেক পরে পড়াশোনা করে জেনেছি , এই কুমারখালি যে একটা পুরনো শহর তার গুরুত্বপূর্ণ একটা নিদর্শন হলো এই পুতুলবাড়ি। আমি যখন গেছি তখনই এই বাড়িটিতে একটি সরকারি অফিস ছিল। অর্থাৎ মূল মালিকদের কেউই তখন ছিলেন না। আর আমার এই ভ্রমণের প্রায় একশ বছর আগে ১৮৫৫ সালে কুমারখালি থানা গঠিত হয়েছিল। এর দু’বছরের মধ্যেই ১৮৫৭ সালে কুমারখালি হয়েছিল মহকুমা শহর। পাবনা জেলার অধীনে ছিল সেই মহকুমা। ১৮৫৭ সালটি বাংলা তথা ভারতীয়
উপমহাদেশের ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই বছর পলাশীর যুদ্ধের  অর্থাৎ ইংরেজদের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের (১৭৫৭ সাল) একশ বছর পূর্তি হয়েছিল। আবার এই বছরই ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহ। সেই টালমাটাল সময়ে পাবনা জেলায় এই নতুন মহকুমাটি যুক্ত হয়েছিল। মহকুমা শহর কুমারখালিতে অনেক সম্ভ্রান্তজনেরা এসেছিলেন। সেখানে গড়ে উঠেছিল অনেক দালানকোঠা। এভাবেই পেরিয়ে গেল প্রায় একযুগ। তারপর ১৮৬৯ সালে গঠিত হলো কুমারখালি পৌরসভা। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো পৌরসভাগুলোর একটি। বাংলাদেশের প্রথম পৌরসভাগুলো গঠিত হয়েছিল ১৮৬৪ সালে। সেই বছরই ঢাকা পৌরসভা গঠিত হয়েছিল। ঢাকা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো সিটি করপোরেশন। এই ঢাকা পৌরসভা গঠনের মাত্র চার বছরের মধ্যেই গঠিত হয়েছিল কুমারখালি পৌরসভাটি। ১৮৬৯ সালে তখনকার অবিভক্ত বাংলায় কয়েকটি পৌরসভা গঠিত হয়েছিল। তারমধ্যে অন্যতম ছিল পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর। এটি এখন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জেলা শহর। কুষ্টিয়া এবং মেহেরপুর পৌরসভাও ১৮৬৯ সালেই গঠিত হয়েছিল। তো যা হোক  কুমারখালি, খোকসা, পাংশা ও বালিয়াকান্দি থানাগুলো নিয়ে গঠিত হয়েছিল কুমারখালি মহকুমাটা । এখন কুমারখালি ও খোকসা থানা বা উপজেলা দুটো পড়েছে  কুষ্টিয়া জেলায়, আর পাংশা ও বালিয়াকান্দি পড়েছে রাজবাড়ী জেলায়। এরই মধ্যে একযুগেরও বেশিকাল মহকুমা হিসেবে টিকে থাকার পর ১৮৭১ সালে কুমারখালির পদাবনতি হলো। কুমারখালি মহকুমা আর রইল না। ফলে শহরটা মহকুমা শহর থেকে পরিণত হলো থানা শহরে। নদিয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার একটি থানা হিসেবে যুক্ত হলো। সেই থেকে কুমারখালি পাবনা জেলা থেকে নদিয়া জেলায় চলে গেল। নদিয়া এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা। এই জেলার কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর মহকুমা তিনটি সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পর পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়।

পুতুলবাড়ি দেখিয়ে মামা আমাকে নিয়ে গেলেন খানিকটা দূরে একটা তালগাছের কাছে। গাছটার গায়ে বাঁশ বাঁধা। আর তার মাথায় ঝুলছে মাটির হাঁড়ি। মামা বললেন,  ওই হাড়ি যারা লাগিয়েছে তাদের বলে গাছি। তারা তালের রস বিক্রি করে পেট চালায়। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই একজন সত্যিকারের গাছির দেখা মিলল। তিনি মাটির হাঁড়ি নিয়ে আরেকটা তালগাছের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এ-ই আমার জীবনে প্রথম গাছি দর্শন।

তখনো কুমারখালি সম্পর্কে অনেককিছুই অজানা ছিল আমার। আসলে বহু কিছুই বোঝার বয়স হয়নি। বড়ো হয়ে শুনেছি, কুমারখালি নাকি তখনো তাঁতের কাপড়ের জন্যে বিখ্যাত ছিল। সপ্তাহে একদিন সেখানে সারারাত ধরে চলত তাঁতে বোনা গামছা, লুঙ্গি ও চাদরের হাট। ধীরে ধীরে জানতে পেরেছি, কুমারখালি থানার (এখন উপজেলা) শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে ১৮৯০ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারির কাজে থেকেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (জন্ম: ১৮৬১খ্রি.; মৃত্যু : ১৯৪১খ্রি.)। এখানে থাকার সময় তিনি সোনার তরী ও চিত্রার মতো কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। কুঠিবাড়ির কাছে মুঘল আমলের টেরাকোটায় (বিভিন্ন রকমের ছবি সম্বলিত পোড়ামাটির ফলক) মোড়া মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে। কুমারখালির অন্তর্গত ছেউড়িয়া গ্রামে বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত বাউল সাধক ফকির লালন শাহের (জন্ম: আনুমানিক ১৭৭২খ্রি.; মৃত্যু:১৮৯০ খ্রি.) সমাধি আছে।  জানা যায় যে,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ো ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাঙাল হরিনাথ, জলধর সেন, মীর মশাররফ হোসেন এরা সবাই লালনের পরিচিত ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে লালনের সুসম্পর্ক ছিল। কুমারখালির চাপড়া ইউনিয়নের লাহিনিপাড়া গ্রামে জন্মেছিলেন বাংলার মুসলিম সমাজের পথিকৃৎ ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও কবি মীর মশাররফ হোসেন (জন্ম: ১৮৪৭খ্রি.; মৃত্যু: ১৯১২খ্রি.;)। একশ বছরের বেশিকাল ধরে কারবালা কাহিনি নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলার ঘরে ঘরে পঠিত হয়ে আসছে। রায় বাহাদুর জলধর সেনের (জন্ম: ১৮৬০খ্রি.; মৃত্যু: ১৯৩৯ খ্রি.) জন্মও কুমারখালিতে। তিনি সেকালের একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি দু’বার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহ-সভাপতি ছিলেন। ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন, রম্যরচনা লিখেছেন,  উপন্যাস লিখেছেন। তবে পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও তিনি খুব বিখ্যাত। বঙ্গবাসী, হিতবাদী, সুলভ সমাচার ও ভারতবর্ষ সম্পাদনা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। কুমারখালির আরেক বিখ্যাতজন কাঙাল হরিনাথ। তার আসল নাম হরিনাথ মজুমদার (জন্ম: ১৮৩৩খ্রি.; মৃত্যু:১৮৯৬ খ্রি.)। ১৮৬৩ সালে তিনি প্রথম প্রকাশ করেন ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামের সংবাদপত্র। সংবাদপত্রটি ছাপানোর জন্যে ১৮৭৩ সালে কুমারখালিতে বসেছিল ছাপাখানা। পত্রিকাটি প্রথমে মাসিক, তারপর পাক্ষিক ও শেষে সাপ্তাহিকে পরিণত হয়েছিল। জমিদার ও ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লিখে পত্রিকাটি বিপদে পড়েছিল। শেষে তা বন্ধও হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের পুরনো পত্রিকাগুলোর মধ্যে যেমন ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র নাম রয়েছে,  তেমনি পুরনো ছাপাখানাগুলোর মধ্যে একটি হলো এই ছাপাখানাটি।  ছাপাখানাটিতে আজকাল অবশ্য কিছু ছাপানো হয় না। তবু শহরের কুণ্ডুপাড়ায় একটা ঘরে আজও সংরক্ষণ করা হচ্ছে সেই ছাপাখানা। তো যা হোক, লালন শাহের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল হরিনাথের। তিনি অনেক বিখ্যাত বাউল গান রচনা করেছিলেন এবং নিজে ফকির চাঁদ বাউল নামেও পরিচিত ছিলেন। লালন এবং কাঙাল হরিনাথের গানের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের ওপরও পড়েছিল। এছাড়া অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, দীনেন্দ্রনাথ রায় ও জলধর সেনকে কাঙাল হরিনাথের শিষ্য বললে বেশি বলা হয় না। বিখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়দের আদিনিবাস অর্থাৎ গ্রামের বাড়ি কুমারখালির কয়া গ্রামে৷ তাঁর ‘আমার ছেলেবেলা’ নামের লেখায় পড়েছি, ‘আমার দাদুর বড়ো দিদির ছেলে বাঘা যতীন’ (ডিঙিনৌকো, ছোটোদের বার্ষিকী,  সম্পাদক: সুনির্মল চক্রবর্তী, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা, ২০১৯,পৃ. ২৭)। সেই লেখাতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে, তাঁদের বাড়িতেই থেকে গিয়েছিলেন বিপ্লবী বাঘা যতীন (জন্ম:১৮৭৯খ্রি. ; মৃত্যু: ১৯১৫খ্রি.)। এই কয়া গ্রামেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক আকবর হোসেন।

এইসব বিখ্যাতজনদের স্মৃতিধন্য অনেক জায়গা, যেমন শিলাইদহ, লাহিনীপাড়া,  ছেউড়িয়া প্রভৃতি স্থানে বড়ো হয়ে আমি গেছি। তবে ছোটোবেলার দেখা কুমারখালি বলতে সবার আগে মনে পড়ে সেই পুতুলবাড়ির কথা। অবশ্য আমার বাবার বন্ধু সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া চাচার (স্বাধীনতার পর এক ঈদের জামাতে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছিল; তাঁর ছেলে আমার বাবার ছাত্র আবুল হোসেন তরুণ পরবর্তীতে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন) একতলা বাড়িটার কথাও মনে আছে। পুরনো আমলের বড়ো বড়ো দোতলা বাড়ি আর উঁচু থামওয়ালা বারান্দার কথা আজও মনে পড়ে। চোখ বন্ধ করে দূর অতীতের দিকে তাকালে অস্পষ্ট ছবির মতো ভেসে ওঠে সেইসব ঘরবাড়ি, দোকানপাট, পথঘাট।