নস্টালজিয়ার আরেক নাম ঈদ নাটক

354
নস্টালজিয়ার আরেক নাম ঈদ নাটক
জনপ্রিয় নাটক আজ রবিবার এর একটি দৃশ্য। ছবি সংগৃহীত

আল সানি :

মোবাইল ফোন তখন সবে মাত্র আসতে শুরু করেছে। ফজলুল রহমান বাবু ডাক পিয়ন। প্রতিদিন কয়েকশ’ চিঠি আসে তার পোষ্ট অফিসে। চিঠির খামের ঠিকানা দেখে বাড়ি বাড়ি যেয়ে চিঠি দেয়, দুই মিনিট বসার সময় থাকে না। তবুও সবার কুশলাদী জানতে ভুল হয় না। মোবাইলের ব্যবহার বাড়তে থাকে গ্রামে। চিঠিও কমতে শুরু করে। ফজলুর রহমানের কাজ কমে যায়। গ্রামের এ মাথা থেকে ওই মাথা যাওয়া হয়ে উঠে না। কাজ পাগল মানুষটা বুদ্ধি করে ঢাকায় যেয়ে নিজের টাকা দিয়ে অসংখ্য খাম কেনে, খামের ভিতর সাদা কাগজ ঢুকিয়ে গ্রামের সবার ঠিকানা খামের উপর লেখে। ভাবে এভাবে প্রতি মাসে একবার করে এসে সবার নামে চিঠি পোষ্ট করবে। গ্রামে চিঠি গেলে সবার বাড়ি বাড়ি আবার যেয়ে চিঠি পৌছিয়ে দেবে। ফলে তার আনন্দের এই কাজটা আবার কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে। তবে বিধিবাম! সবাই সাদা কাগজের চিঠি পেয়ে ভাবলো হয়তো গ্রামে কোনো ডাকাত আসবে, তাই আগে থেকেই সতর্ক করে দিয়েছে। অনেক আগে এভাবেই সাদা কাগজ দিয়ে ডাকাতরা তাদের আগমনের বার্তা দিতো। সব সন্দেহ যায় ফজলুর রহমান বাবুর দিকে; কারণ ঢাকায় যেয়ে তাকে অনেক চিঠির খাম কিনতে দেখেছে গ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছেলে। বাবুর আহাজারি আর কেউ শোনে না। সবাই তাকে শাস্তি দেয়। শেষ অব্দি পোষ্টমাস্টারের একমাত্র মেয়ে নুসরাত ইমরোজ তিশা সবাইকে থামিয়ে ফজলুল রহমানের সব কথা শোনে। মোবাইলেই আগ্রাসনে তার আনন্দের কাজে ভাটা পড়ে, তাই সে এই কাজটা করেছে।

ফজলুল রহমান বাবু। অভিনয় করেছিলেন ডাক পিয়ন চরিত্রে।
ফজলুল রহমান বাবু। অভিনয় করেছিলেন ডাক পিয়ন চরিত্রে। ছবি সংগৃহীত

প্রায় এক যুগ আগে ঈদের সময় নাটকটা দেখছিলাম। এখনো মনে হয় প্রতিটি দৃশ্য চোখের সামনে ভাসে। কাহিনী-সংলাপ সব কিছুই মনে রাখার মতো।

আমাদের কিশোর সময়ের নাটকগুলো ঠিক এরকমই ছিল। জাহিদ হাসান, তারিন, মাহফুজ ইসলাম, মীর সাব্বির, আবুল হায়াত, মো আজিজ, সারা জাকের, তৌকির আহমেদ, সূবর্ণা মোস্তফা, আফজাল হোসেন আরো কতো শতো অভিনেতা আমাদের ঈদের দিন গুলোকে রঙিন করে রাখতো। অভিনয়, কাহিনী সব কিছুতেই থাকতো বৈচিত্র্য। বোনাস হিসেবে ছিল হূমায়ুন আহমেদ ও হানিফ সংকেতের নাটক। সেই দিনগুলো কেটে গেছে অনেক আগেই। এখন অভিনয় শিল্পীতে বৈচিত্র্য নেই, অভিনয় শিল্পে রোমাঞ্চ নেই, কাহিনী-সংলাপে আকর্ষণ নেই। মনে হয় যেনো এক নাটকই প্রতি ঈদে মোড়ক বদলিয়ে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে দর্শক হারাতেই থাকছে দেশি টিভি চ্যানেলগুলি আর দর্শক বাড়ছে অনলাইন স্টিমিং সাইটগুলোতে।

ঈদের নাটকগুলোর আয়োতন বেড়েছে, এখন প্রায় অর্ধশত বাংলা টিভি চ্যানেলে সাত দিন ধরে ঈদের নাটক প্রচারিত হয় তবে কোনো একটা দৃশ্য দেখার পরেও মনে দাগ কেটে যায় না। নাম গুলোতেও নেই সৃজনশীলতা। পরিবারের সবাই মিলে ঈদের রাতে নাটক দেখার সেই আনন্দ কিংবা ঐতিহ্য সবই আমরা প্রায় হারাতে বসেছি। এভাবে চলতে থাকলে ঈদ নাটকগুলোও আমাদের কাছে হারানো রত্ন হয়েই থাকবে, হাজারো চেষ্টা করেও সেই রত্ন খুজে পাওয়া যাবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।