তদন্তে ভুল ছিল

251
তদন্তে ভুল ছিল
তদন্তে ভুল ছিল Colletcd Picture

অরুণ কুমার বিশ্বাস :

 

আবিরের ছোটমামা থানার বড় দারোগা। সপ্তায় একবার অন্তত তিনি ভাগনেদের সাথে জমিয়ে আড্ডা মারেন। আড্ডায় নাকি মাথা খোলে। চোর-ছেঁচড় ধরতে সুবিধা হয়।
তোরা কী খাবি বল! মিষ্টি নাকি ঝাল? চোখ নাচিয়ে বললেন ছোটমামা।
ওরা সমস্বরে বলল, মিষ্টি। ছানাবড়া আর বালিশ মিষ্টি চাই।
বালিশ মিষ্টি কেন ভাগনে! খাবে নাকি শোবে! আদুরে গলায় ছোটমামা বললেন।

তদন্তে ভুল ছিল
তদন্তে ভুল ছিল
ছবি : সংগৃহীত

আবিরের বন্ধুরাও বালিশ মিষ্টির পক্ষে। তারা সব একযোগে মাথা নাড়লো। বালিশ চাই, চমচম বা ছানার জিলিপি হলে হবে না।
মিঠেল হেসে হারু ময়রার দোকানে লোক পাঠালেন মামা। তারপর জম্পেশ আড্ডা। বুঝলি আবির, চোর-ছেঁচড়রা আজকাল মোটে মাথা খাটায় না। সব বোকার হদ্দ। বেকুবের মতো কাজ করে আর অল্পতে ধরা খায়। এদের মেরেধরে আর সুখ পাই না! হাত-পা স্রেফ জমে গেল। এমনভাবে বললেন যেন পেটানোর জন্যই পুলিশমামা।
মামার কথায় সায় দিয়ে ওরা সব দমদেয়া পুতুলের মতো মাথা নাড়লো। ঠিক তক্ষুনি হন্তদন্ত হয়ে ছোটমামার চেম্বারে ঢুকলো থানার মেজদারোগা নরেশ। মেনিমুখো দেখতে। মোটেও ভয়ংকর নয়। নাকের নিচে গোঁফও নেই। ভুঁড়িও নেই। বড্ড ছেলেমানুষ।
কী হে নরেশ, খুনের কিনারা হল? স্পটে গিয়ে কী দেখলে সব খুলে বলো। তবেই খুনি কে সেটা আন্দাজ করতে পারবো।
নরেশ ঠক্ করে একখানা স্যালুট ঠুকে যা যা দেখেছে তার বয়ান দিতে লাগলো। স্যার, গোড়া থেকে বলি-
গিয়ে দেখি দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, তবে জানালার কাচ ভাঙা। মুরগির খোপের মতো ফুটো। সেই ফুটো দিয়ে অনায়াসে কেউ ঢুকে যেতে পারে। বাসার সামনে এক চিলতে বাগান। সেখানে সবজির চাষ করা হয়েছে। গুটিগুটি করোলা আর কচি লাউ ঝুলছে। চালকুমড়ো আছে, তবে চালে নয়, আমগাছের ডালে ঝুলছে।
নরেশ একটু থামলো। আবির ভেবে পায় না, সবজির বাগানের সাথে খুনের কী সম্পর্ক। ব্যাটা গল্পকার হলে ভাল করত। যাকে বলে বর্ণনার বাহাদুর!
ছোটমামা মুচকি মুচকি হাসেন। নরেশের কথা শুনে তার ব্যাপক হাসি পায়, কিন্তু কষ্ট করে চেপে রাখেন। নইলে উর্দির মর্যাদা থাকে না। থামলে কেন? বলো। চালিয়ে যাও।
মজার ব্যাপার কী জানেন স্যার, ঘরের পেছনে গিয়ে দেখি, দুটো কাক কী যেন খাচ্ছে। প্রথমে ভাবলাম পাকা পেঁপে বা কাঁকুই। কেউ কেউ কাকরোল বলে। পরে দেখি তা না, কাক অন্য কিছু খাচ্ছে।
সে আবার কী?
কাকে করোলা খাচ্ছে। হলুদ রঙের পাকা করোলা। কাক কি কখনও করোলা খায় স্যার! আজব না!
অবিরের ছোটমামা আরামচেয়ারে বসে উসখুস করেন। আর ভাবেন, নরেশ বেটা উজবুকই রয়ে গেল, মানুষ আর হল না। তাকে সে কাক আর করোলার গপ্পো শোনাচ্ছে! নির্ঘাত পেট খারাপ!
নরেশ কী বুঝলো কে জানে। সে দাঁত বের করে হাসে। যেন কাক আর করোলার গল্প শুনে তার বস খুব খুশি হয়েছেন।
স্যার, ভিকটিম একা থাকতেন। রাতের বেলা ঘরে আর কেউ ছিল না। তার পরিবার নাকি আলাদা থাকে।
কী করে বুঝলে নরেশ, আর কেউ ছিল না?
না মানে অন্য কারো পায়ের ছাপ বা বিছানা-পত্তর, থালাবাসন…! খাবারঘরে এঁটোকাঁটা একজনের মতোই হবে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপাতত থালাতেই থাকো তুমি। আগে বেড়ো না। নাও এবার আসল কথা বলো, খুন কীভাবে হল। মাথা নাড়লেন ছোটমামা।
আবির মজা পায়। এঁটোকাঁটা দেখেও তাহলে খুনের তদন্ত হয়! কী বুঝমান বলো!
ভিকটিম কেন একা থাকতেন জানতে চাইলেন না স্যার! একটু যেন নাখোশ দারোগা নরেশ।
বলবে! বলো তাহলে। পরিবার তারে দেখতে পারে না, তাই তো! ছোটমামা বিরস মুখে বললেন।
না মানে স্যার, লোকটা নাকি খুব উল্টাপাল্টা। মানে রাত জাগে দিনে ঘুমায়। মানুষের গোবর দিয়ে সারজাতীয় কিছু বানানো যায় কিনা এইসব ভাবতো। বলুন কী পাগল!
হুম! মামা কিছু বললেন না, শুধু শব্দ করলেন। দারোগা বেটা ধান ভানতে শিবের গান শুরু করেছে। বেকুব একটা!
নরেশ আবার শুরু করে। রসুইঘরে নল দিয়ে ছ্যার ছ্যার করে পানি পড়ছিল। কাঁচা ডিমের গন্ধ। পেঁয়াজের খোসা। কেমন যেন ওমলেট ওমলেট ভাব। জানেন তো স্যার, ওমলেট আমার বেজায় পছন্দ। গাঁয়ের দিকে একে মামলেটও বলে। চুলোয় হাত দিয়ে দেখি বেশ গরম। খুনটা করে খুনি নিশ্চিন্তে নুডল্স বানিয়ে খেয়েছে। চীনেভাষায় চাওমিন। কফিও পান করেছে সে। তার মানে খুনি অচেনা কেউ নয়। ভিকটিমের কাছের কেউ হবে।
বাহ বাহ! তোমার মাথায় মেলা বুদ্ধি নরেশ। অমনি তুমি ধরে নিলে নুডলস খুনিই খেয়েছে! কেন, যে বেটা খুন হলো সে কি খেতে পারে না! তার মুখ নেই! নাকি সে বাদুড়! মুখ দিয়ে খায় না, শুধু পটি করে।
নরেশ লোকটা আদতে ভোলাভালা। মামার কথার খোঁচাটা সে ধরতে পারে না। ভ্যাবলার মতো হেসে বলল, তা অবশ্য পারে। তবে কি স্যার, মরার আগে তো কেউ নুডল্স খায় না। ভালমন্দ কিছু খায়। এই যেমন ধরেন, কাতলার কালিয়া, রাজহাঁসের কষা মাংস, চুঁইঝালের জলখাসি!
রাখো তোমার জলখাসি। মামার চোখে রাগ, আবিরদের ঠোঁটে হাসি। কথা বেশি বলে! বড্ড বাচাল।
এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি খুনের তদন্ত করতে গেছ! রামঝাড়ি দেন ছোটমামা। ভয়ে আবিররাও কেঁপে উঠলো। একেই বলে বড় দারোগার ঘাঁউ। বাঘের হুংকারের চেয়ে কিছু কম নয়। মামাকে নিয়ে আবিরের খুব গর্ব হয়।
থতমত খায় দারোগা নরেশ। মিনমিনে সুরে বলে, লাশ খাটের নিচে অর্ধেক, আর বিছানায় ছিল অর্ধেক। এমনভাবে উপুড় হয়ে পড়েছিল যেন তিনি সন্ধ্যা নদীতে সাঁতার কাটছেন।
কী নদী বললে?
সন্ধ্যা নদী।
তোমার বাড়ি বরিশাল, তাই না নরেশ।
জি স্যার। ইউ আর রাইট স্যার। খুশি হয় নরেশ। দেশের টান বড় টান। একেই বলে দেশপ্রেম।
লোকটা কী করে মারা গেল কিছু অনুমান করতে পারছ নরেশ? গুলি-টুলি?
না স্যার, গায়েপিঠে কোথাও গুলির চিহ্ন নেই, তবে কাটা দাগ ছিল। গলায়। তাকে ক্ষুর চালিয়ে খুন করা হয়েছে। যদ্দুর মনে হয় স্পট ডেড। মানে বেচারা ভিকটিম ক্যাঁ করারও সুযোগ পাননি। ক্ষুরের এক টানে খালাস! কথাটা বলেই নরেশ হাতের ইশারায় নিজের গলায় ক্ষুরের টান টেনে দেখাল। মানে সে অভিনয়ে পাকা এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
বেশ বেশ! ওটা যে ক্ষুরের পোচ কী করে বুঝলে হে নরেশ? তুমি তো সামনে ছিলে না। পুট করে ফুট কাটলেন ছোটমামা।
না মানে স্যার, এত সূ² কাটাদাগ, খুব ধারালো কিছু হলেই তা সম্ভব। ক্ষুর না হোক, ব্লেড হবে। বিদেশি জিলেট। নরেশ বেশ জোরের সাথে বলল। বলার ঢঙে আবিররা খুব মজা পায়। ইনি দারোগা না হয়ে সিনেমায় নামলে পারতেন। চোখমুখের ভঙ্গিমা ভাল। বেশ নাটকীয়। কমেডি হলে আরো ভাল মানায়। চেহারায় একরকম দুষ্টুমিষ্টি ভাব আছে।
তারপর শুনুন স্যার, তার পরনে ছিল লুঙ্গি, উদোম গা। খুব গরম তো, তাই হয়তো শার্ট খুলে রেখেছিলেন। সে এক কেলেংকারি কাণ্ড। তার লুঙ্গিটাও কোমরঅব্দি উঠে গিয়েছিল। ইয়ে মানে ওটাও দেখা যাচ্ছিল। কী লজ্জার কথা বলুন!
দারোগার কথা শুনে মুচকি হাসেন ছোটমামা। আবির হো হো করে হাসে। ওর দেখাদেখি অন্যরাও। এমন মজার পুলিশ ওরা আর দেখেনি। বলে কিনা ইয়ে মানে ওটা দেখা যাচ্ছিল। বলতেই হয় তার নজর ভাল।
বুঝলেন স্যার, তিনি অতি সজ্জন মানুষ। খুব বই পড়তেন। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বই পড়া যায়। তিনিও পড়ছিলেনÑ কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস। গোয়েন্দাগল্পের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন বোঝা যায়।
কী নাম বললে? কার বই পড়ছিলেন?
বিশ^খ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমস। ওই যে ট্রেনিং-এর সময় আপনারা আমাদের যা পড়িয়েছেন। খুব বড় গোয়েন্দা।
ছোটমামা এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন।
ডিটেকটিভ শার্লক হোমস! তার মানে আমরা গোয়েন্দা গল্পও পড়ছি আজকাল! খুব ভাল। নরেশ, এবার একটু ডিটেলে বলো তিনি ঠিক কোন্ গল্পটা পড়ছিলেন? কত দূর অব্দি?
কী যেন ভাবছে নরেশ। মাথা চুলকায়। তারপর বলে, জি স্যার, মনে পড়েছে। ‘দ্য সাইন অফ ফোর’।
ছোটমামা মনে মনে খুশি হন। যাক, নরেশকে তিনি বেশ ভালই তালিম দিতে পেরেছেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে সে খুব ভাল করে সব নজর করেছে। লোকটা বই পড়ছিল, কী বই তাও মনে রেখে দিয়েছে নরেশ। এই না হলে পুলিশ! কেসটা খুব সহজেই খোলসা হবে বলে তিনি আশা করছেন।
কত দূর অব্দি পড়েছিলেন মনে আছে নরেশ? ফের জানতে চান আবিরের ছোটমামা।
অনেকখানি পড়েছিলেন স্যার। তালপাতার পাখার মতোন মাথা নেড়ে নরেশ বলল। বইয়ের ৩৩-৩৪ পৃষ্ঠা খোলা ছিল। কয়েকটা জায়গায় লাল দাগ। লাইনের নিচে দাগ কেটে রেখেছেন।
ঠিক বলছো তো নরেশ! তোমার স্মরণশক্তি এত প্রখর! ভুরু নাচিয়ে বললেন ছোটমামা!
জি স্যার। আমার ঠিক মনে আছে, সাইন অফ ফোর, পৃষ্ঠা নম্বর ৩৩-৩৪।
আবির ও তার বন্ধুরা মামাকে দেখছে। মামা খরচোখে নরেশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আবির বুঝতে পারে মামা রেগে যাচ্ছেন। চেহারা ক্রমশ বিলিতি বেগুনের মতো লাল হয়ে উঠেছে। এবার তিনি ঘাঁউ করে উঠবেন। নরেশের চাকরি নট। কিন্তু ওরা বুঝতে পারে না, নরেশ ভুলটা আসলে কী বলল!
তুমি একটা ফোর-টুয়েন্টি মানে চারশ বিশ। মোটেও তুমি স্পটে যাওনি। কারো মুখ থেকে শুনে খুনের রিপোর্ট করেছ! বাকিটা স্রেফ গালগপ্পো। শার্লক হোমস আমিও পড়ি নরেশ।
জি স্যার! কেন স্যার? আমি সেখানে গিয়েছি। ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খায় থানার অতিচালাক দারোগা। ঘন ঘন ঢোক গেলে। দাঁতে নখ খুঁটে। মানে সে ভয় পেয়েছে। আর মানুষ তখনই ভয় পায়, যখন সে কোনো অপরাধ করে ফেলে।
ফের মিথ্যে কথা! মোটেও তুমি সেখানে যাওনি। পুরোটাই ধাপ্পা। মামা আবারও ধমক দেন। বসের ঝাড়ি।
তারপর মামা বললেন, তুমি একটা বোকামি করে ফেলেছ। তুমি পাকা মিথ্যুক নরেশ। ভেবেছো পুলিশে চাকরি করি বলে বইটই পড়ি না। দুনিয়ার কোনো বইয়ে বিজোড় আর জোড় পৃষ্ঠা পাশাপাশি থাকে না, থাকে জোড়-বিজোড়। ৩২-৩৩ পৃষ্ঠা বললে ঠিক ছিল। তুমি সেখানে যাওনি তাই কেসটা বিশ্বাসযোগ্য করতে ভুল মেরে দিয়েছ। তোমার গোড়ায় গলদ, তাই প্রোমোশনটা আর পেলে না নরেশ। নাও, এবার বসে বসে বালিশ মিষ্টি খাও। এটা তোমার গালগপ্পের পুরস্কার।
মামার কথা শুনে আবির অবাক। অমনি হাতের কিশোরপত্রিকা খুলে দেখে ঠিক তাই। পাশাপাশি জোড়-বিজোড় পৃষ্ঠা থাকে। আর বিজোড়-জোড় হয় কেবল পাতার এপিঠ-ওপিঠ। নরেশ মিথ্যে বলেছিল যে বইয়ের ৩৩-৩৪ পৃষ্ঠা খোলা দেখেছে। একটা ছোট্ট মিথ্যার কারণে ফেঁসে গেল নরেশ।
সে যে ঠিকঠাক তদন্ত করেনি তা ধরা পড়ে গেল।