ঢাবির দুই শিক্ষার্থীর সাইকেলে ৩৪৫ কিমি পথ পাড়ি : ”একটু করে এগোচ্ছি আর আমরা বাড়ির কাছাকাছি চলে আসছি।”

292
সাইকেলে ৩৪৫ কিমি পথ পাড়ি
সাইকেলে ৩৪৫ কিমি পথ পাড়ি দিলেন (বাম থেকে) মো. মমিনুল ইসলাম ও মো. তৌহিদুল ইসলাম জাহিদ

মো. তৌহিদুল ইসলাম জাহিদ

বিভিন্ন সময়ে সুযোগ পেলেই অ্যাডভেঞ্চার করার একটা সুপ্ত ইচ্ছা আমাদের আছে। ১৪ এপ্রিল যখন কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেওয়া হলো তখনই সাইকেলে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসে৷ আমার বাড়ি নীলফামারী সদর, ঢাকা থেকে ৩৪৫ কিলোমিটার। আর আমার বন্ধু মমিনুলের বাড়ি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, ঢাকা থেকে ৩৪৬ কিলোমিটার।

চলেছি নাড়ির টানে!
চলেছি নাড়ির টানে!

আমার বন্ধু মমিনুলের সাথে শেয়ার করলাম আইডিয়ার কথা। ও প্রথমে রাজি না হলেও ২/১ দিন পরে রাজি হয়ে যায়। আমরা প্ল্যান করি যে, ৩০ এপ্রিলের দিকে রাওয়ানা দিব। এর জন্য প্রথমেই আমাদের প্রধান অস্ত্র সাইকেল দরকার। আমরা শুরু করে দিই আমরা সাইকেল খোঁজা। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ এতো লম্বা পথ পাড়ি দেয়ার জন্য যেমন তেমন সাইকেলে হবে না। খুব ভাল সাইকেল লাগবে।
আমরা ২টা সাইকেল অনেক খোঁজাখুঁজির পর কিনে ফেলি এবং মেরামত করিয়ে উপযুক্ত করে নিই।
প্রাথমিকভাবে আমাদের টার্গেট ছিল ৬০০০ টাকা করে একেকটা সাইকেল কিনব। কিন্তু এই বাজেটে হয়নি। মেরামতসহ প্রতি সাইকেলের দাম ৯০০০ টাকা করে লাগে।
২৮ তারিখ সেহরি খেয়ে ভোর ৫ টায় আমরা রওয়ানা দিই ঢাকার কল্যাণপুর নতুনবাজার দোতালা মসজিদের সামনে থেকে। লকডাউনের কারণে এই আইডিয়া মাথায় আসলেও আমাদের মূলত উদ্দেশ্য ছিল একটা অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করা। এছাড়াও গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। আমরা মোট ৮ টি জেলা ভ্রমণ করেছি এই যাত্রায়। ঢাকা – গাজীপুর – টাঙ্গাইল – সিরাজগঞ্জ – বগুড়া – গাইবান্ধা – রংপুর – এবং নীলফামারী/দিনাজপুর।
আমাদের সাইক্লিং করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। মূলত এই সাইকেলটি ছিল আমার জন্য প্রথম ‘গিয়ার সাইকেল’, আর মমিনুলের দ্বিতীয়। কিন্ত আমরা এই সাহসী উদ্যোগ নেয়ার আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলাম আমাদের ফিজিক্যাল ফিটনেসের কারণে। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে সুরক্ষিত থাকার উদ্দেশ্যে আমি গত বছরের মার্চ থেকে নিয়মিত ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ (Calisthenics) করছি। নভেম্বর থেকে মমিনুল ইসলামও আমার সাথে যোগ দেয়। ফলে আমাদের ইতোপূর্বে কোনো সাইক্লিং করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও আমরা এটা করার সাহস পাই।

রাতের অন্ধকারে সাইকেল নিয়ে এড়িয়ে চলেছি
রাতের অন্ধকারে সাইকেল নিয়ে এগিয়ে চলেছি

আমাদের প্ল্যান ছিল ১ ঘণ্টা করে সাইকেল চালানো এবং ১০/১৫ মিনিট বিশ্রাম করা। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রথম থামি আমরা। এরপর মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সামনে থেমে কিছু খাবার খেয়ে নেই। সাথে বাদাম, কিসমিস, গুড়, স্যালাইন রেখেছিলাম। এরপর আমরা সাইকেল চালাতে থাকি। সকালে অনেক জোরে চালাতে পারছিলাম। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোদের তাপ বেড়ে যায়। তাপমাত্রা ৩৬/৩৭ ডিগ্রির কম ছিল না। আর পুরো রাস্তার কাজ চলার কারণে রাস্তার দু’পাশে কোনো গাছ ছিল না, ফলে কোন ছায়াও ছিল না। এই গ্রীষ্মের পুরো রোদটা আমাদের মাথার উপর দিয়ে গেছে৷ এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এর মধ্যে আমরা খাবার নিয়ে খুব সচেতন ছিলাম। কারণ খাবার ঠিকমত না খেলে, নিউট্রিশনটা মেইনটেইন না করলে শরীর ভেঙ্গে পড়বে। যেমন সকাল বেলাতেই যদি আমরা ২/৪টা পরোটা খেয়ে নেই, তাহলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে৷ এই সমস্যা নিয়ে এগোনো অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। যাই হোক, এই রোদের মধ্যে আমরা পথ চলতে থাকি৷ সানগ্লাস ছিল বলে অনেকটাই রক্ষা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমার সানগ্লাসটি বঙ্গবন্ধু সেতুর ২০ কিলোমিটার পূর্বে একবার থেমেছিলাম, সেখানে হারিয়ে ফেলি৷ এরপর একটা সানগ্লাস অদল-বদল করে আমরা চলতে থাকি। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়া নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কারণ ওখানে সাইকেল উঠতে দেয়া হয় না। তবে ওখানে কর্তব্যরত কর্মকর্তাগণ আমাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। ওনারা আমাদেরকে নিজ দায়িত্বে সাইকেল সহ একটা পিকাপ ভ্যানে তুলে দিয়েছেন। আমরা সেতুর এপারে এসে নেমে গিয়েছি।
আমরা রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় থেমে কলা, দই, জুস, এবং বিশেষ করে পানি পান করি৷ এরপর সিরাজগঞ্জে একটা ছোট হোটেলে আমরা খাওয়া দাওয়া করি দুপুরের। খাবারটা দারুণ ছিল। উল্লেখ্য, আমরা মুসাফির হিসেবে রোজা ছিলাম না। এরপর আমরা সাইকেল চালিয়ে সিরাজগঞ্জ পার হয়ে বগুড়ায় ঢুকি। এখানে আমরা ঝড়ের কবলে পড়েছিলাম। আমাদের থাকতে হবে বগুড়ার শেরপুরে। সেকারণে একটা লেগুনা নিয়ে আমাদের আসতে হয় ১৫ কিলোমিটার রাস্তা। এই ১৫ কিলোমিটার রাস্তা আমাদের পদধূলি থেকে বঞ্চিত হয়।
সেদিন হোটেলে ঢুকে অনেক ক্লান্তি এবং দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। তবে আমরা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে আমরা পারব। সেদিন রাতে খেতে পারিনি, কারণ দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটাও একটা দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। পরদিন শরীরের রেসপন্স কেমন হবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা।
তবে পরদিন সকালে উঠে আমরা কিছু বাদাম খেয়ে নিই, যা অনেকক্ষণ পর্যন্ত শক্তি যোগায়।
বগুড়া শহরে এসে আমরা সকালের নাস্তা করি। এরপর এক টানে আমরা ৫০ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেই। চলে আসি গাইবান্ধার ফাঁসিতলায়। ওখানে একটু রেস্ট নিই এবং আবারো ৫৫ কিলোমিটার রাস্তা একবারে যাওয়ার জন্য উদ্যোগ নিই। সাইকেল চালাতে আগের দিনের চেয়ে বেশ ভালো লাগছিল খুশিতে এবং উত্তেজনায়৷ কারণ একটু করে এগোচ্ছি আর আমরা বাড়ির কাছাকাছি চলে আসছি।
রাস্তায় আমরা অনেক আনন্দ এবং উপভোগ করতে পেরেছি। রংপুরে এক জায়গায় রাস্তার পাশে দেখি ডিজেল চালিত স্যালো মেশিন চলছে, ওখানে নেমে আমরা গোসল করি। এরপর কিছুদুর এগিয়ে রাস্তার পাশ থেকে ১.৫ কেজি শসা কিনে দুজনেই খেয়ে ফেলি। কারণ দুপুরের এই চড়া রোদে পিপাসা তখন তুঙ্গে। এটা অনেক ভাল এবং টেকসই হাইড্রেশান ছিল। ওখানে কিছু চালের রুটি খেয়ে নিই। ওখান থেকে বের হয়ে বিকাল ৩ টায় আমরা রংপুর বাস টার্মিনালে পৌঁছাই। তখন আমাদের মধ্যে বিজয়ের হাসি চলে এসেছে।

মোট সময় : বিশ্রাম এবং খাওয়া দাওয়ার সময় সহ আমাদের মোট ড্রাইভিং টাইম ছিল ২ দিনে ৩২ ঘণ্টা। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৬/১৭ কিলোমিটার চালাতে পেরেছি।

মোট দুরত্ব : আমার ৩৪৫ কিলোমিটার, মমিনুলের ৩৪৬ কিলোমিটার। মমিনুলের বাড়ি দিনাজপুরের চিরিবন্দর। পাগলাপীর বাজার থেকে আমি জলঢাকা রোডে আসি আর মমিনুল সৈয়দপুর রোডে যায়।
করোনা পরিস্থিতি : আমরা সবসময়ই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দোকানপাটে কেনাকাটা, খাওয়া দাওয়া করেছি, এবং যখন কোথাও নেমেছি মাস্ক পরে নিয়েছি।

দূর্ঘটনা : কোনো অঘটন ঘটেনি। তবে রাতে সাইকেল চালানো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, তাই রাতে সাইকেল না চালানোই উচিত।
আমার অনুভূতি – ‘সমস্ত প্রসংশা মহান আল্লাহ তা’আলার। তার অশেষ করুণা এবং রহমতে আমরা এই দুরন্ত যাত্রা সফল ভাবে শেষ করতে পেরেছি। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করেছেন এবং শুভকামনা জানিয়েছেন, সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’

আমাদের দেখে উৎসাহিত হয়ে কেউ যেন এরকম উদ্যোগ না নেন এ ব্যাপারে আমার বন্ধু মমিনুল সতর্ক করেছেন। কারণ আমরা অনুভব করেছি যে ফিজিক্যাল ফিটনেস যথেষ্ট না থাকলে এই অভিযাত্রা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। সাইকেল চালাতে যে কার্ডিও এক্সারসাইজটা হয় এটা নিতে পারতে হলে শরীরের বিশেষ সক্ষমতা থাকতে হবে অবশ্যই। আর নিউট্রিশন বুঝে খাওয়া দাওয়া করার মানসিকতা ও অভ্যাস থাকতে হবে।

বাড়ি ফেরার পর অনেকেই আমাদের শারিরীক অবস্থা ঠিক আছে কি-না এই নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ আছি এবং ভালো আছি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : সাইক্লিং নিয়ে আপাতত কোন পরিকল্পনা আর নেই। তবে অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় হিসেবে আমরা সব সময়ই সুযোগের সন্ধানে থাকব। আমরা আমাদের ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ চালিয়ে যাব এবং আমরা ভবিষ্যতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দূর্গম জায়গা গুলোতে ঘোরার ইচ্ছা রাখি।

আমরা তরুণ সম্প্রদায়ের সবাইকে নিয়মিত ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করার প্রতি উৎসাহিত করার ইচ্ছা পোষণ করছি আমাদের এই সফল উদ্যোগটির মাধ্যমে।

চলেছি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই
চলেছি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই

সাইকেল আরোহীদের পরিচয় :
১. মো. তৌহিদুল ইসলাম জাহিদ (২৫)
২. মো. মমিনুল ইসলাম (২৫)
উভয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ২০ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।