জীবনের প্রথম কিছু গল্পের বই

270
জীবনের প্রথম কিছু গল্পের বই
পাঠ্যাভ্যাস গড়ে উঠুক শৈশবকাল থেকেই। ফাইল ছবি

সত্যজিৎ বিশ্বাস:

এখনকার বাচ্চাদের মতো দশ বাই দশ স্কয়ার ফিট দেওয়ালময় আমাদের শৈশব ছিল না। খোলা মাঠ আর অঢেল গল্পের বইয়ের রাজ্যে বড় হয়েছি আমরা। ল্যাপটপ হাঁটুরউপর রেখে বালিশে হেলান দিয়ে গল্পের বই পড়া কিংবা জয়স্টিক নিয়ে টেলিভিশনে ফুটবল খেলার মতো দুর্ভাগ্যও আমাদের ছিল না। আমরা হেলান দিতাম খোলা মাঠে, গাছের ডালে, সিলেট মেডিকেল কলোনীর আদর্শ বিদ্যালয়ের সিঁড়িতে কিংবা ছাদের মেঝেতে।

 

আমার জীবনের প্রথম গল্পের বই ঠাকুরমার ঝুলি। তার সাথে এসেছে গোপাল ভাঁড়ের গল্প, ভূতের গল্প,ঈশপের গল্প, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। আমাদের পাশের বাসার তাপুদের বাসায় প্রথম সন্ধান পাই নারায়ন দেবনাথের অমর সৃষ্টি নন্টে-ফন্টে আর হাঁদা-ভোদার গল্পের সিরিজ। তার কিছু পরেই হাতে আসে প্রানের চাচা চৌধুরী, বাটুল দ্যা গ্রেট, ফ্যান্টম। রাহাত খানের গল্পের বইগুলো কি যে ভালো লাগতো। দিলুর গল্পগুলো পড়ে জীবনে কতবার যে দিলু হতে চেয়েছি।

আরেকটু বড় হতেই হাতে পাই সেবা প্রকাশনীর বই। সেবা প্রকাশনী আমাদের কলোনীতে ঢোকে সুনামি হয়ে। সেই সুনামিতে ভেসে যায়নি এমন কোনো ছেলে আছে বলে মনে হয়না। মনে পড়ে, বড়ভাই তখন পড়তো সিলেট পাইলট স্কুলে। বাবা তাকে যে রিক্সা ভাড়া+টিফিনের টাকা দিতো সেটা সে খরচ না করে সেবা প্রকাশনীর মাসিক ম্যাগাজিনগুলো কিনে নিয়ে আসতো। কিশোর ক্লাসিক তিন গোয়েন্দার কিশোর, মুসা, রবিনের কর্মকাণ্ডে ডুবে ছিলাম বেশ কিছুদিন। গোয়েন্দাগিরি ছাড়াও কিশোরের প্রতি জিনার হাল্কা টান ছিল উপরি মজা।

এরপরেই হাতে পেলাম দুর্দান্ত কিছু অনুবাদকৃত বই- টম সয়ার, হাক্যাল বেরী ফিন, লস্ট ওয়ার্ল্ড, অল কোয়াইট ইন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, কালো তীর, আশি দিনে বিশ্ব ভ্রমন। দস্যু বনহুর থেকে কুয়াশা সেখান থেকে মাসুদ রানা – এইসব সিরিজের যে বই যখন পেতাম ওই দিনেই শেষ না করে ওঠাওঠি নেই। এ যেন পরীক্ষার আগের রাতের পড়ালেখা। অবশ্য এই তাড়াহুড়ার কারণও ছিল। সব বই কেনার মত সামর্থ্য ছিল না। তাই বন্ধুদের সাথে অদল বদল করে নিতাম এক রাতের জন্য। ওয়েস্টার্ন গল্পের বইগুলোর কথা মনে পড়লেই কলোনীর মামুন, রুমেনদের কথা মনে পড়ে। কী পরিমান যে পাগল ছিল এসব বইয়ের। কলোনীতে কেউ কাউকে দেখলেই খেলনা পিস্তল নিয়ে আমরা ড্র করতাম। যখন তাও থাকতো না, খালি হাতেই ড্র হতো।
এস এস সি পরীক্ষা শেষ হবার পর সতেরো দিনে শেষ করেছিলাম স্যার আর্থার কোনান ডায়েলের(অনুবাদ) শার্লক হোমস সমগ্র। দিনে-রাতে, শুয়ে-বসে এমনকি ভাত খেতাম গল্পের বইয়ে চোখ রেখে। এই বইটা এতোটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, কোন কিছু দেখেই অনুমান করে বলার চেষ্টা করতাম। অনুমান শক্তি যে কত বড় শক্তি এ বইটা পড়লে টের পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প আমাকে প্রথম ভাবতে শেখায়, মানুষের জীবন কতই না বিচিত্র জগত। হৈমন্তী থেকে শুরু করে অপরিচিতা, স্ত্রীর পত্র, ভাইফোঁটা, বলাই, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, মধ্যবর্তিনী– বাঙ্গালীকে সারা পৃথিবী থেকে আলাদা দেখতে শেখায়। শরৎ চন্দ্র আমার কাছে পেঁয়াজের মতো। যতই ভেতরে গেছি ততই চোখের জল ঝরেছে। মুক্তিযুদ্ধ কি জিনিষ প্রথম বুঝেছি জাহানারা ইমামের লেখনীতে। ওপার বাংলার সাত মহারথীতো কিংবদন্তী তুল্য। বিভূতি ভূষন বন্দোপাধ্যায়, শঙ্কর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার,সত্যজিৎ রায়,বুদ্ধদেব বসু। এঁদের যখন যাই পড়েছি তাইই ভালো লেগেছে।

এবার অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদের কথা। মধ্যবিত্তের চাহিদা,সুখ, আনন্দ, বেদনার কথা হুমায়ূন আহমেদের মত করে এতো সহজ করে কেউ বলতে পারেনি। তার বই মানে একটা অদ্ভুত জাদু। একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায়না। মজার মজার কথা বলে মনের মধ্যে পোঁচ দেবার সে এক বড় কারিগর। তসলিমা নাসরিনের লজ্জা পড়ে চাপা অভিমানে ভুগেছি বেশ কিছু দিন। কিছু ক্ষত দেখা যায় না কিন্তু পুড়িয়ে ছাই করে-‘লজ্জা’ সেই বই। এ দেশে আমি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক এ সত্যটা কেন জানি মানতে ইচ্ছা করেনা।

কিছু লেখক আছে- যাদের কোনো বই আলাদা করে ভালো লেগেছে বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। ওনারা লিখতে গিয়ে সারাজীবন নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা করে গেছেন। তাই তাদের একটার থেকে আরেকটা বই আরো বেশি ভালো লেগেছে। আমি বরং সেই সব লেখকদের নাম বলি, যাদের সবগুলো(যতটা পড়েছি) গল্পের বই আমার কাছে ভালো লেগেছে।

 

১। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – ছোটো গল্প সমগ্র।
২। নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়- টেনিদা সমগ্র।
৩।সত্যজিৎ রায়- ফেলুদা সমগ্র।
৪। রাহাত খান- ছোটদের গল্প সমগ্র।
৫। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় – সব, সব, সব।
৬। তিন গোয়েন্দা সিরিজ – সব, সব,সব।
৭। জুলভার্ন,অগাথা ক্রিস্টি,আলেক জান্ডার দুম্যা – সব, সব, সব।
৮। আর্থার কোনান ডায়েল- শার্লক হোমস সমগ্র।
৯। হুমায়ূন আহমেদ – হিমু সমগ্র।
১০। মোহাম্মদ জাফর ইকবাল- ছোটদের লেখা সব, সব, সব।