করোনার প্রভাব পড়ছে কিশোর–কিশোরীর মনোজগতে

220
করোনার প্রভাব পড়ছে কিশোর–কিশোরীর মনোজগতে
করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও কিশোর–কিশোরীদের মনোজগতে এর প্রভাব থেকে যাবে বহুদিন। ছবি সংগৃহীত।

কিশোরকাল রিপোর্ট :

শাহানার বয়স ১২ বছর। রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে সে। মা–বাবার সঙ্গে রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় থাকে। শাহানার বাবা বললেন, ‘প্রায় দু’এক মাস আগে আমার মেয়ের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুলে যেতে পারে না, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। সারা দিন ঘরে থাকতে হয়। আবার পেশাগত কাজ করতে গিয়ে আমার দেহে করোনাভাইরাস। বাধ্য হয়ে আমি ঘরের বাইরে থাকি। এখন মেয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। মেয়ের কিছুই ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলে সে।’

রাজুর বয়স এখন ১৪ বছর। রাজধানীর একটি স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র সে। মা–বাবার সঙ্গে থাকে একটি ফ্ল্যাটে। দেশের অন্যসব শিক্ষার্থীর মতো এখন ঘরবন্দী।
রাজু বলল, ‘স্কুল বন্ধের প্রথম এক সপ্তাহ ঘরে থাকতে ভালো লেগেছিল। এখন মোটেও ভালো লাগে না। মন খুব খারাপ হয়। কিন্তু কী করব? বন্ধুদের কথা খুব মনে পড়ে। স্কুলে গিয়ে একসঙ্গে গল্প করতাম, খেলাধুলা করতাম। এগুলো খুব মিস করছি। জানি না আর কত দিন এভাবে ঘরে বন্দী হয়ে থাকতে হবে?’

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকারি সিদ্ধান্তে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের স্কুল–কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। দেশের সব শিক্ষার্থী এখন ঘরে অবস্থান করছে। স্কুল-কলেজ খোলা থাকার সময় একজন শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন রুটিনে বৈচিত্র ছিল। কিন্তু এখন তাদের একঘেয়ে সময় কাটাতে হচ্ছে। করোনার এই মহামারির সময়ে সবচেয়ে বেকায়দায় রয়েছে কিশোর-কিশোরী। আবার করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া ও সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন মনোচিকিৎসক জানান, করোনা ভাইরাসের এই সময়ে কেউ ভালো নেই। সবাই একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। নিকট অতীতে করোনাভাইরাসের মতো এমন মহামারি দেখার অভিজ্ঞতা কারও নেই। এতে স্বাভাবিকভাবে সববয়সী মানুষের ভেতর একটা আতঙ্ক রয়েছে। কিশোর–কিশোরীর আতঙ্ক আবার বেশি। প্রতিদিন এই বয়সে তারা নতুন নতুন জিনিস শেখে। নিজেদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। সামাজিক দক্ষতা তৈরি হয়। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের দৈনন্দিন রুটিনে মারাত্মক ছন্দপতন হয়েছে। এই বয়সীরা সাধারণত সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করে, তাদের মনের কথা শেয়ার করে। কিন্তু সেগুলো তারা পারছে না। ফলে তাদের ভেতর মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন, ‘লকডাউন কিংবা কোয়ারেন্টাইন সিচুয়েশনে কিশোর কিংবা কিশোরী কিন্তু বাইরে বের হতে পারছে না। এমনিতে এই বয়সে প্যারেন্টসদের (মা–বাবা) সঙ্গে একটা ডিসটেন্স (দূরত্ব) থাকে। তারা ঘর থেকে বাইরেও বের হতে পারছে না। তারা একটা সমস্যার মধ্যে আছে। তারা হয়ত বুঝতে পারছে না, তারা কী করবে? কেউ কেউ টেকনোলোজির সঙ্গে বুদ হয়ে যাচ্ছে। আঠার মতো লেগে থাকছে। বাবা-মা হয়তো তাদের মানা করছেন। বাবা-মা তাদের যা করতে বলছে, তা তারা করতে চাইছে না। তারা এখন একই ছাদের নিচে। দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার কারণে তাদের ওপর অনেক বেশি নজরদারি বেড়েছে। স্বাধীনভাবে তারা কিছু করতে পারছে না। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারছে না, বাইরে যেতে পারছে না। বাইরে খেতে যেতে পারছে না। তারা আড্ডা দিতে পারছে না। আড্ডা থেকে যে প্রাণশক্তি আমরা পাই, সেই প্রাণ শক্তি থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে অভিভাবকদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে তাদের ভেতর মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। করোনা ভাইরাসের মহামারি চলে গেলেও এই ধরনের মানসিক অসুস্থতা কিন্তু ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।’

করোনা ভাইরাসের মহামারি চলে যাওয়ার পরও কিশোর বয়সী ছেলেমেয়ে আগের মনোজগতে ফিরতে পারবে না বলে মনে করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘যেকোনো বৈশ্বিক মহামারি বা মহাদুর্যোগ যখন ঘটে, তখন তা মানুষকে কেবল শারিরীকভাবে আক্রান্ত করে না, তার মনন, তার চিন্তা, তার সামাজিকতা, তার অর্থনীতি, তার রাজনীতি সব বিষয়কে কিন্তু নতুন মোড়ের দিকে নিয়ে যায়। সেই ধারা থেকে কিন্তু আমাদের কিশোর বয়সীরা বাইরে না। কিশোরদের যে বয়স, সেটা বিকশমান। তারা বিকাশের পর্যায়ে থাকে। এই করোনা ভাইরাসের মহামারি চলে যাওয়ার পর তাদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটবে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসবে এবং সর্বোপরি অনেক অভ্যাস পরিবর্তন হবে। অর্থাৎ, তাদের মনোজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।’