আমাদের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মত জীবন্ত ছবি ফুটিয়ে তোলে

201
আমাদের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মত জীবন্ত ছবি ফুটিয়ে তোলে
মিশন হাকিম নগর '৭১ বইয়ের প্রচ্ছদ

শিমুল শাহিন :

মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আমাদের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, চলচ্চিত্র আর সাহিত্যের হৃদ কুঠোরের পুরোটা জুড়েই মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার সূদীর্ঘকাল পরেও অদ্যাবধি লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে, বাঙালির পরাধীনতা নিয়ে, স্বাধীনতা নিয়ে আর একতাবদ্ধ বাঙালির অসীম সাহস নিয়ে। বিভিন্ন স্বনামী লেখকদের অসাধারণ লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত অসংখ্য মননশীল লেখা আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য সাহিত্যকর্ম- তবুও পাঠকরা এ থেকে কখনো এতটুকুও বিমুখ হন না, বরং সুখপাঠ্য হিসেবে সবার কাছে সমাদৃত হয়ে পছন্দের তালিকার শীর্ষেই থাকে।
একুশে বইমেলা ২০২০, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও যে অসংখ্য সৃষ্টিশীল মানুষের কলমের আঁচড়ে মুক্তিযুদ্ধের ছোট্ট ছোট্ট ঘটনাগুলো শব্দগুচ্ছ হয়ে একেকটা বই হিসেবে মলাটবদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হবে তা বলে দিতে জ্যোতিষ হওয়া লাগে না! সদ্য আত্মপ্রকাশ করা পেন্সিল প্রকাশনের স্টলেই পেলাম এরকম একটা বইয়ের খোঁজ- ‘মিশন হাকিম নগর’৭১’।

অধ্যায় ভিত্তিক সাজানো বইটিতে সর্বমোট বিশটি অধ্যায় আছে। প্রথম অধ্যায়েই শুরু থেকেই লেখকের অসাধারণ লেখনী আর নৈপূণ্যগুণ মস্তিস্কগোচরে আসবে। সুন্দর সুন্দর শব্দগুচ্ছ সাজিয়ে তিনি গ্রাম আর প্রকৃতিকে এমনভাবে ফু্টিয়ে তুলেছেন তাতে চোখের সামনে ছবির মত হয়ে ভেসে উঠতে বাধ্য। ক্যানভাসের মত একটা গ্রাম, সবুজ বুনো গাছ, নদী, কাঁশফুল, শিশিরবিন্দু- এক নিমিষে মনে হবে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতাগুলোর গদ্যরূপ পড়ছি না তো!
উপন্যাসের প্লটটি আবর্তিত হয়েছে মূলত ছোট্ট এক মেয়ে ঈশিতাকে কেন্দ্র করে। ঈশিতার দস্যিপনা যেকোেনা পাঠককে নিয়ে যাবে কৈশোরে।
প্রথম অধ্যায় শেষেই মূলত গল্পের উষ্ণতা কিঞ্চিত আঁচ করা যায়। ছবির মত সুন্দর নন্দীপুর গ্রামটাতে বিষাক্ত সাপতূল্য ভয়াবহ ছোবল নিয়ে এগিয়ে আসছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। ভাতৃত্ব, বন্ধুত্ব আর সম্প্রীতির বন্ধনগুলোয় চিঁড় ধরতে শুরু করেছে। গ্রামের কিছু মানুষ অবস্থান নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে আর গুটিকয়েক বেছে নিয়েছে বেঈমানীর পথ। ডাক্তার আসাদের মু্ক্তিযোদ্ধা ফরিদ বাহিনীকে আশ্রয় দেয়াকে কেন্দ্র করে শান্তিপূর্ণ গ্রামটায় অশান্তি বাসা বাঁধতে চলেছে তা পরিষ্কার কুদ্দুসের কথাতেই, ‘হে ঘরে মুক্তি আইন্যা তুলছে, বেকুবের মত কাম করছে একটা।’
গল্পটা ভিন্ন বাঁক নেয় যখন দেখি আসগর মাতব্বর আর তাঁর পরিবারের উপর ঘটে যায় পাকিস্তানীদের বর্বরতা। যে আসগর মাতব্বর চায়নি পাকিস্তানীদের বিপক্ষে তার গ্রামবাসী যুদ্ধে যাক- তার পরিবারের উপরই নেমে আসে বিভীষিকা। পুরো গ্রামে বেশ কিছু বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, তারমধ্যে আসগর মাতব্বরের বাড়িটাও ছিল। আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় তার বড় মেয়ে, গুলি করে মেরে ফেলা হয় তার মেয়েজামাই লোকমানকেও।
পাকিস্তানীদের নির্মমতা প্রকাশ পায় ছোট্ট ঈশিতার বাবা-মায়ের হত্যাকাণ্ড দেখে। এরকম হাজারো ঈশিতা মুক্তিযুদ্ধের সময় বুক চাপড়ে কেঁদেছে বাবা মায়ের লাশ বুকে নিয়ে। পাকিস্তানীদের নাকের ডগা থেকে তাদের অস্ত্রভর্তি ট্রাক লুণ্ঠন করে আসাদ ডাক্তার, তৌকির ডাক্তার আর ডাক্তার আতিকরা আমরা সাধারণ পাঠকদের মনে করিয়ে দেয় শহীদ রুমিদের সেসব রোমহর্ষক অভিযানের কথা। ফরিদ, তার বাহিনীর তেরোজন সদস্য আর বিক্ষুদ্ধ গ্রামবাসীর নিঁখুত আক্রমণ মনে করিয়ে দেয় সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাদের একেকটা গেরিলা যুদ্ধ। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে যাবার জন্য যখন সেলিম হেসে বলে, ‘মারা গেলে যাবো। দেশের জন্যই তো মরছি। এমন দেশের জন্য হাজারবার চোখ বন্ধ করে মরা যায়’ – তখন পাঠকমাত্র সকলের গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায় অদ্ভূত শিহরণে। এরকম নানা শব্দগুচ্ছ আমাদের ভেতর দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে, শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেয়।

পুরোটা উপন্যাস জুড়েই মনে হয়েছে লেখক তার উপন্যাসে যুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর। ‘দূরে কোথাও শেয়াল ডেকে ওঠে। লাশের গন্ধ পেয়েছে বোধহয়। মানুষগুলো চলে গেলেই ওরা এগিয়ে আসবে। টেনে হিচড়ে লাশ খাওয়া শুরু করবে অভূক্ত শেয়ালগুলো।’- এই কয়েকটা বাক্য আমাদের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মত জীবন্ত ছবি ফুটিয়ে তোলে। শিল্পীর ক্যানভাসে কিংবা ফটোগ্রাফারের নিপুণ দক্ষতায় যেমন আমরা দেখেছি পথের ধারে, ডোবায়, আঙিনায় বাঙালির গলে-পচে যাওয়া লাশের ছবি- ঠিক যেনো তেমনিই কিছু ছবি নিদারুন দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।

জীবনের বিনিময়ে কেনা আমাদের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা একদা বিক্রি করে দিয়েছিল রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামক কিছু বিশ্বাসঘাতকের দল। উপন্যাসে এসব বেঈমানের প্রতিনিধিত্ব করে সিরাজ, বদি, কুদ্দুস- এরকম বেশ কিছু চরিত্র। এদের কর্মকাণ্ড এতটাই নৃশংস যে ঘৃণায় অবলীলায় ওদের মুখে ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে থুতু! আর এ ঘৃণাই বাংলার যুবাদের আর আপামর জনগণকে উৎসাহিত করে যুদ্ধে যাবার, প্রতিশোধ নেবার। লেখক ভুল বলেননি, ‘অকুতোভয় একদল যুবক বুকে সাহসের কমতি নেই ওদের। চোখে কেবল একরাশ ঘৃণা ধিকিধিকি করে জ্বলছে।’

উপন্যাসের শেষটায় দেখতে পাই সেই ছোট্ট ঈশিতা বেশ বড় হয়ে গেছে। ছোট্ট তরুকে নিয়ে এসে ও দেখায় লেবু গাছ তলের তার বাবা-মায়ের কবর দুটি। চোখে জল আসে ঈশিতার, গলা রোধ হয়ে আসে- তবুও ও শ্বাস নিতে পারে প্রাণ ভরে। লেখক এখানেও দূর্দান্ত, এই দৃশ্যটা অনেকটা মেটাফোরিক। ঈশিতার বাবা মায়ের কবর দুটি যেন আমাদের শহীদদের বদ্ধভূমি, যেখানে গিয়ে তাঁদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে আমরা আজও বুকভরে নিতে পারি শ্বাস।

‘মিশন হাকিমনগর’৭১’ আপাদমস্তক একটা মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক উপন্যাস। কিশোর উপন্যাস হিসেবে একে মূল্যায়িত করার চেয়ে বলা যায় এই বইটি যেকোেনা বয়সী পাঠকদের কাছেই সমাদৃত হবার যোগ্য। অত্যন্ত সুখপাঠ্য এ উপন্যাসটির প্রতিটি পাতার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা একেকটা শব্দগুচ্ছ পাঠক উপলব্ধি করাবে শহীদদের আত্মত্যাগ, তাদের অকুতোভয় সাহস, জাগ্রত করবে দেশাত্মবোধ।
লেখক নিসা মাহজাবীন বাংলা সাহিত্যাকাশে একজন তরুন তুর্কী। সম্ভাবনাময়ী ও যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হিসেবে উনার যৎসম্ভব সাফল্য কামনা করি।

 

উপন্যাস : মিশন হাকিম নগর’৭১
ধরণ : কিশোর উপন্যাস
লেখক : নিসা মাহজাবীন
প্রকাশনী : পেন্সিল প্রকাশন
মূল্য: ২১০ টাকা