অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০: জনস্রোতে ভাষার জন্য ভালোবাসা

133

চারদিকে মানুষের ঢল। এত বড় পরিসর নিয়ে মেলা তবুও হাঁটতে কষ্ট হয়। শিশু, কিশোর, তরুণ, তরুণী- সব বয়সী মানুষ। মহান একুশের দিনে ভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে সবাই এলেন বর্ণমালা খচিত পোশাকে। মেলায় বইয়ের বিকিকিনির পাশাপাশি সবার মুখে মুখে ছিল একুশের দিনের কথা।

অমর একুশের দিনটি শোকের। তবে এ শোক এখন শক্তিও। সারাবিশ্বে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। এদিন ভাষা দিবসের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে পথে নেমেছে জনতার ঢল।

শহীদ মিনারের বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসেন বইমেলায়। এদিন মেলার দ্বার খুলে যায় সকাল ৮টায়, মেলা চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। সারাদিনই মেলায় ছিল জনতার আনাগোনা। তবে সন্ধ্যায় তিল ধারণের জায়গা ছিল না সোহরাওয়ার্দী ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। মেলায় মানুষের সমাগমের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও ছিল বেশ।

মূলমঞ্চের আয়োজন : গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে সকাল সাড়ে ৭টায় হয় স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। এতে শতাধিক নবীন-প্রবীণ কবি কবিতা পাঠে অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন কবি রুবী রহমান। বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বক্তৃতা।

‘বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ও সাম্প্রতিক উন্নয়ন’ শীর্ষক একুশে বক্তৃতা প্রদান করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনের সার্বক্ষণিক চিন্তা ছিল বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ বাঙালির কথা। তার ‘সোনার বাংলা’ প্রত্যয়ে দেশ বাংলা ও বাঙালি এ দুই ধারণাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিক আয়তনে ছোট, জনসংখ্যায় বিশাল, এ দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে, খাদ্যসহ সব ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে হবে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর দেশ-দর্শনে সামাজিক ও শ্রেণিগত বৈষম্য আদৌ গ্রহণযোগ্য ছিল না। মহান এই নেতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তারই মতো অসমসাহসী ও বিচক্ষণ। তিনি তার পিতার, আমাদের জাতির জনকের, স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্য-দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ তার সব সমস্যা ও সংকট সত্ত্বেও উন্নয়নের ধারায় যে অনেক ধাপ এগিয়ে গেছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের ন্যায়পূর্ণ বণ্টন নিশ্চিতের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করতে হবে এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

স্বাগত ভাষণে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মহান পরম্পরায় ২০২২ সালে ভাষা আন্দোলনের সত্তর বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। বাংলা একাডেমি জাতীয় জীবনের এই তিন মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে এখন থেকেই নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন মিনার মনসুর, শিহাব সরকার, আনিসুল হক এবং শেখর বরণ দাশ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও জালাল উদ্দিন হীরা।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল ফকির সিরাজের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী’র পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী ফকির আলমগীর, কল্যাণী ঘোষ, বুলবুল মহলানবীশ, মহাদেব ঘোষ, সমর বড়ুয়া এবং নাহিদ নাজিয়া।

লেখক বলছি মঞ্চ : লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন জিএইচ হাবীব, শাহেদ কায়েস, শিল্পী রহমান ও সুহান রিজওয়ান।

নতুন বই : বইমেলায় শুক্রবার নতুন বই এসেছে ৫০৮টি। এর মধ্যে আগামী প্রকাশনী এনেছে ‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র’, আবিষ্কার এনেছে রবিউল হুসাইনের কাব্যগ্রন্থ ‘কি আছে এই অন্ধকারের গভীরে’, মহাকাল এনেছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কাব্যগ্রন্থ ‘ছিন্নভিন্ন অপরাহ্ন’, রীনা মজুমদারের ‘বাস্তবতার বেড়াজালে’, কথা প্রকাশ এনেছে মুনতাসীর মামুনের ‘বাংলাদেশ ১৯৭১ গণহত্যা নির্যাতনের রাজনীতি’, পুথিনিলয় এনেছে জাকির তালুকদার ‘গল্প সমগ্র ২’, বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ‘তিনটি গোয়েন্দা কাহিনী’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘তোমার ভালোবাসা’, য়ারোয়া বুক কর্নার এনেছে কাজী রোজীর ‘শেখ মুজিবুর বাঙালির বাতিঘর’, জ্ঞানকোষ এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘আমার সাইন্টিস মামা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

আজকের মেলা : আজ শনিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২১তম দিন। মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর।

সকাল ১১টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এমপি।

বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পাঠ করবেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন ড. সোনিয়া নিশাত আমিন, গোলাম কুদ্দুছ ও মামুন সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করবেন ড. মুহাম্মদ সামাদ।