অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ করো

217
অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ করো
অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ করো ছবি সংগৃহীত

সুদিপ্ত কুমার নাগ :

আজকালকার বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীদের একটা সাধারণ সমস্যা হলো- এরা কিছুক্ষণ পরপর বলে যে, কিছুই ভালো লাগে না। হতাশ হয়ে গেলাম। অমুকের এই আছে, সেই আছে, কিন্তু আমার নেই কেন?
আমি যদি এখন উল্টো প্রশ্ন করে বলি যে, তোমাদের কী এমন হয়েছে যে হতাশ? তোমার বাবা-মা বা পরিবারের কেউ কি মারা গেছে যে কিছুই ভালো লাগছে না? তোমার বয়স কত যে এখনই মনে এত এত হতাশা? পরী¶ায় খারাপ করার কারণে বা নাম্বার কম পাওয়ার কারণে কেন মন খারাপ কর?
আজকে আমি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো তাতে এসব সমস্যার বেশিরভাগ সমাধান পেয়ে যাবে।
‘কিশোরকাল’ ম্যাগাজিনের অধিকাংশ পাঠকই কিশোর বা তরুণ। আর এই কিশোর বা তরুণ বয়স এমন একটা সময় যেটার উপর জীবনে সাফল্য পাওয়া বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া নির্ভর করে।
আর এসময়ে প্রত্যেক কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদেরকে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত যা জীবনে সাফল্য পেতে খুব কাজ করে। সেই অভ্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো- অন্যের সাথে তুলনা না করা।
অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ করতে হবে। অমুকের এই আছে, কিন্তু আমার নাই সেজন্য মন খারাপ করা চলবে না। তোমার কী আছে আর তুমি কী পারো, সেটাই মূল বিষয়। মনে কর, তোমার বন্ধু কোনো এক পরীক্ষায় ১০০-এর মধ্যে ৯৫ পেয়েছে আর তুমি পেয়েছো ৬৫। তুমি অন্যের চেয়ে কম পেয়েছো জন্য মন খারাপ করলে এবং বাসায় তোমার বাবা-মা যখন শুনবে তোমার বন্ধু ৯৫ পেয়েছে আর তুমি ৬৫ পেয়েছো, তখন তোমার উপর দিয়ে একপ্রকার ঝড় বয়ে যাবে। সুতরাং, বাসায় বাবা-মা জানলে কী হবে সেটা চিন্তা করে তোমার হতাশা আরও বেড়ে গেল। আবার মনে কর, কোনো এক পরী¶ায় তুমি ১০০ এর মধ্যে ৬৫ নাম্বার পেয়েছো। দেখা গেলো তুমি ৬৫ পেয়ে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছো এবং সারা বাংলাদেশে আর কেউ এতো নাম্বার পায়নি। তখন তোমার খুব আনন্দ লাগবে আবার তোমার বাবা-মা তোমাকে নিয়ে খুব গর্ব করবে এবং এলাকায় ও পরিচিত ব্যক্তিদের বাসায় এরজন্য তোমার বাবা-মা মিষ্টি বিতরণ করবে।
এবার ঘটনা দুইটার মধ্যে তুলনা করা যাক। দুইটা পরীক্ষাতেই তুমি ১০০ এর মধ্যে ৬৫ পেয়েছো কিন্তু প্রথম ক্ষেত্রে তোমার মন খারাপ হয়েছে আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তুমি খুব খুশী হয়েছ। প্রথম ক্ষেত্রে তোমার মন খারাপের কারণ হলো, তোমার একজন বন্ধু পেয়েছে ৯৫ নাম্বার আর তুমি পেয়েছো ৬৫। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে খুশি হওয়ার কারণ হচ্ছে, তুমিই সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছো এবং আর কেউ সেই পরিমাণ নাম্বার পায়নি। এখন আমি যদি জিজ্ঞেস করি যে, তুমি কি এই দুইবারের ঘটনায় একবারও নিজেকে জিজ্ঞেস করেছো যে আসলে আমি সেই বিষয়ে কতটা পারি বা শিখেছি? তোমার বাবা-মা বা তুমি তখনই খুশী হচ্ছ যখন তুমি অন্যের থেকে বেশি ভালো করছো। আবার অন্যের চেয়ে কম নাম্বার পেলে তোমার এবং তোমার বাবা-মা সবার মন খারাপ হচ্ছে। আসলে তুমি সেই বিষয়ে কতটা শিখেছো বা জ্ঞান অর্জন করেছো সে বিষয়ে তোমার আর তোমার বাবা-মা ভেবে দেখছ না। যারফলে, সবসময় এই অন্যের সাথে তুলনা করতে যেয়ে তুমি এবং তোমার বাবা-মা সর্বদা হতাশ হয়ে যাচ্ছ। আসলে তুমি নিজে কী জানো, সে বিষয়ে কতটা পারো, এসব বিষয়ে গুরুত্ব দাও। অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ কর। প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা এবং একেকজন একেক বিষয়ে দক্ষ। হয়তো তুমি এখনও জানো না যে, তুমি কী ভালো পারো। দেখা গেলো যে, তুমি যে বিষয়ে তোমার বন্ধুর চেয়ে কম নাম্বার পেয়েছো সে বিষয়ে তুমি তোমার বন্ধুর চেয়ে বেশি জানো কিন্তু পরীক্ষায় হয়তো তোমার বন্ধু কয়েকটা বিষয় পড়ে গিয়েছিল আর সেগুলো কমন পেয়ে সে ভালো নাম্বার পেয়েছে কিন্তু তুমি সব পড়ে যেয়েও নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে লিখতে না পারার কারণে কম নাম্বার পেয়েছো।
এজন্য তোমাদেরকে এখন থেকেই এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে যে, আমি কখনও অন্যের সাথে তুলনা করবো না। নিজের যা আছে, তাই নিয়ে এগোতে থাকবো।
আবার দেখা যায় যে, তোমার বন্ধুর আইফোন আছে আর তোমার সাধারণ ফোন আছে। এজন্য তুমি হতাশ। আরেক বন্ধুর পরী¶ার রেজাল্ট ভালো আর তোমার খারাপ, এজন্য মন খারাপ। কেউ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সারা দেশের মধ্যে সেরা পুরস্কার পেলো আর তুমি সেই প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়লে। সারাদিন বাসায় বাবা-মায়ের বকা খেতে খেতে তোমার অবস্থা কাহিল। এসব কিছু মিলে তুমি বারবার বলে থাকো যে, ‘কিছুই ভালো লাগে না’। আসলে এতো খারাপ কিছুর মাঝে ভালো লাগবে কীভাবে? এক্ষেত্রে তোমাকে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে আর নিজের মতো করে চেষ্টা করে যেতে হবে। হঠাৎ করেই সবকিছুর পরিবর্তন করা যাবে না। পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রপতি আছে যাদের মধ্যে কেউ ৩৫ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতি হয়েছে আবার কেউ ৬০ বছর বয়সে। তুমি হয়তো এখন সফল হতে পারছো না, এর মানে এই না যে তুমি কখনও সফল হবে না। হয়তো ভবিষ্যতে তুমি এখনকার সফলদেরকে হার মানিয়ে যাবে। হয়তো তোমার সময়ে এবং তোমার জায়গায় তুমি সফল, কিন্তু বুঝতে পারছো না!
অনেকে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় খুব ভালো মার্কস পায় এবং ভালো রেজাল্ট নিয়ে এসব পড়াশোনা শেষ করে। কিন্তু যারা বাস্তবতার সাথে মিল রেখে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছে এবং ব্যবহারিকভাবে কাজে দক্ষ, তারাই ভবিষ্যতে ভালো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়। কেউ বাড়ির ডিজাইন করানোর আগে দক্ষ আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ারকে খোঁজে। রোগী ডাক্তার দেখানোর আগে ভালো নামকরা ও অভিজ্ঞ ডাক্তারকে খোঁজে, কখনও ভালো রেজাল্ট করা ডাক্তার দেখে রোগী তার কাছে যায় না।
তুমি চাইলেও হঠাৎ করে অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ করতে পারবে না। এক্ষেত্রর তোমাকে ধীরেসুস্থে চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত চেষ্টা একসময় অভ্যাসে পরিণত হবে। আগে নিজেকে জানো। কোন বিষয়ে ভালো পারো, কী করতে চাও, যে বিষয়ে ভালো পারো সে বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে কী করতে পারবে, এসব বিষয়ে আগে গভীরভাবে চিন্তা করো। আশা করি, এই লেখার শুরুতে আমি তোমাদেরকে যেসব সমস্যার কথা বলেছিলাম, সেগুলোর বেশিরভাগ সমাধান পেয়ে গেছো।